আইসল্যান্ড ভ্রমণে খরচ বাঁচানোর সহজ উপযোগী উপায়

উত্তর আটলান্টিকের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন দেশ আইসল্যান্ড। নামেই পরিচয় দেশটির, চারদিকে শুধু সাদা বরফ আর বরফ। প্রতি বছর প্রচুর মানুষ বিভিন্ন সময়ে আইসল্যান্ডে ঘুরতে যায়। এদের অধিকাংশই উন্নত বিশ্বের নাগরিক। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের জন্য আইসল্যান্ড পর্যটনের দিক দিয়ে খুব বিলাসবহুল দেশ।

আর বিলাসবহুল দেশ হবেই বা না কেন? পৃথিবীর ঠিক অন্যপ্রান্তে যে এর অবস্থান। আইসল্যান্ডে পর্যটন খরচের কথা চিন্তা করে অনেকেই এই দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করে মাঝপথে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তবে কি শুধু টাকার জন্য এত সুন্দর একটি দেশ দেখা হবে না? টাকাই আমাদের ভ্রমণ ইচ্ছায় দাড়ি টেনে দেবে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন আইসল্যান্ডে ভ্রমণকালে টাকা বাঁচানোর কিছু সহজ উপায়। শুরু করার আগে প্রথমেই বলে রাখি, আপনি আপনার আইসল্যান্ড ভ্রমণে এক লক্ষ টাকা খরচ করবেন নাকি দশ লক্ষ সেটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার, তবে আমরা চাই যেটাই খরচ করেন যাতে সেটাতেই সবটুকু ভ্রমণানন্দ পেয়ে যান। চলুন তাহলে গল্প করা যাক আইসল্যান্ডে বাজেট ট্রিপে যাওয়ার কিছু উপায় নিয়ে।

১. আইসল্যান্ড ভ্রমণ করুন অফ সিজনে

ছবিঃ followmeaway.com

যে কোনো দেশের ভ্রমণ স্থানগুলোর অফ সিজন বলে একটা ব্যাপার আছে। অফ সিজনগুলোতে ট্রাভেলার যেমন থাকে না, তেমনি নিরিবিলি থাকে ভ্রমণস্থানগুলো। পর্যাপ্ত পর্যটক না থাকার কারণে অফসিজনে আইসল্যান্ডের থাকার হোটেল থেকে শুরু করে ঘুরে বেড়ানোর গাড়ি ভাড়া সব কিছুই থাকে সাধ্যের মধ্যে।

আইসল্যান্ডে সবাই ঘুরতে যায় জুনের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত। এই সময়টা আইসল্যান্ডের পিক সিজন কারণ তখন গ্রীষ্মকাল চলে। আর গ্রীষ্মকালে যেমন সবকিছুর দাম হয় খুব বেশি তেমনি সৌন্দর্যও থাকে ভরপুর। তাই অন্য সময়ে ভ্রমণে যদি আপত্তি না থাকে তবে জুন থেকে আগস্ট বাদ দিয়ে বছরের বাকি সময়ে আইসল্যান্ড ঘুরতে আসলে খরচ হবে অনেক কম, অনেকক্ষেত্রে গ্রীষ্মকালের তুলনায় অর্ধেক।

২. নির্বাচন করুন সস্তা এয়ারলাইন্সের বিমান টিকেট

ছবিঃ marhaba.qa

বাংলাদেশ থেকে আইসল্যান্ড যাওয়ার অনেক ফ্লাইট আছে। ঢাকা থেকে প্রতিদিনই বিমানগুলো উড়ে আইসল্যান্ডের দুটি এয়ারপোর্ট (কেফ্লাভিক, রেইকজাভিক) এর যে কোনো একটিতে অবতরণ করে। বিমানের টিকেট কাটার ক্ষেত্রে প্রধান বিষয় হলো কত আগে কাটছেন তার উপর টিকেটের দাম নির্ভর করবে। যদি আপনি অন্ততপক্ষে চার/পাঁচ মাস আগে কাতার এয়ারওয়েজের রিটার্ন টিকেট কাটেন তবে প্রতিজনের ৯০,০০০ টাকার মধ্যে টিকেট পেয়ে যাবেন।

আর যদি এক সপ্তাহের ব্যবধানে রিটার্ন টিকেট করেন তবে টিকেটের দাম গড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত যাবে একই এয়ারওয়েজে। প্রথমোক্ত ক্ষেত্রে আইসল্যান্ডের কেফ্লাভিক বিমানবন্দরে পৌঁছাতে সময় লাগবে ৩০ ঘণ্টার মতো যেখানে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সময় লাগবে পাক্কা সাত দিন। দুই ক্ষেত্রে উড়োজাহাজ পরিবর্তন করতে হবে মোট দুই বার। তাই সবদিক বিবেচনা করে আগেভাগেই ভিসা করিয়ে রাখলে টিকেট কাটুন অন্ততপক্ষে চার/পাঁচ মাস আগে।

এয়ার টিকেট সংক্রান্ত সকল তথ্য ট্রিপএডভাইজর ডট কম (www.tripadvisor.com), মেইক মাই ট্রিপ ডট কম (www.makemytrip.com) অথবা এ জাতীয় ওয়েবসাইটে পেয়ে যাবেন। মনে রাখবেন যাত্রার সময়ের উপরও টিকেটের দাম নির্ভর করে, তাই রাত দুইটা-তিনটায় ঘুম ছেড়ে ফ্লাইট ধরতে যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে তিন-চার হাজার টাকা বেঁচে যেতে পারে অনায়াসেই।

৩. তুলনা করে থাকার জায়গা নিবার্চন করুন

ছবিঃ hostel.is

আইসল্যান্ডের রাজধানী আর এদেশের সবচেয়ের বড় শহরের নাম রেইকজাভিক। রেইকজাভিকে আপনি একদম কম দামের হোস্টেল থেকে শুরু করে গেস্ট হাউজ, এপার্টমেন্ট, বিলাসবহুল হোটেল সবই পাবেন হাতের নাগালে। সাথে ভারী লাগেজ আর পরিবার থাকলে কেফ্লাভিক বিমানবন্দরে নামার পর রেইকজাভিক চলে আসবেন গাড়ি ভাড়া করে।

রেইকজাভিকে যে কোনো রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করে সেখানেই লাগেজ আর পরিবারকে অপেক্ষা করতে বলে আশেপাশের হোটেল/হোস্টেলগুলোতে ভাড়ার পরিমাণটা জেনে আসবেন। এতে করে সবচেয়ে কম কষ্টে সবচেয়ে ন্যায্য মূল্যে থাকার জায়গার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার হোস্টেলগুলোতে ভাড়া কম হওয়ার কারণ হলো এখানে এক রুমে আপনার সাথে অপরিচিত অনেকেই থাকতে পারে, তবে বেড শেয়ার করতে হবে না। তাই পরিবার নিয়ে হোস্টেলে ওঠার ক্ষেত্রে আপনি কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন সে বিষয়টা ভেবে নেবেন প্রথমেই।

৪. থাকার জায়গার বুকিং দিন অনলাইনে

ছবিঃ lonelyplanet.com

যারা দেশের বাইরে আসেননি বা একটু অনিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করে থাকেন তাদের অনেকেরই ধারণা বাইরের দেশে হোটেলের ভাড়া আকাশচুম্বী আর রুম পাওয়া খুব মুশকিলের ব্যাপার। ব্যাপারটা মোটেই তেমন না। আপনি চাইলে ঘরে বসেই অনলাইনে বুকিং দিয়ে ফেলতে পারবেন আপনার পছন্দের দেশের পছন্দের শহরের পছন্দের হোটেলের যেকোনো রুম।

ইন্টারনেটের এই যুগে প্রচুর হোটেল বুকিং ওয়েবসাইট, অ্যাপ আছে যেগুলোয় মাত্র ১০ মিনিটে হোটেলের রুম বুক দেয়া যায় এবং বুকিং দিতে এক টাকাও তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করা লাগে না। আইসল্যান্ডের হোটেল/হোস্টেল বা অন্য কোনো ধরনের থাকার জায়গা বুকিং দেয়ার সবচেয়ে ভালো ওয়েবসাইট গুলো হল বুকিং ডট কম (booking.com), হোস্টেল ওয়ার্ল্ড (hostelworld.com), হোস্টেল কম্বাইন্ড (hostelcombined.com), এয়ারবিএনবি (airbnb.com)।

অন্যান্য দেশে এয়ারবিএনবি ভালো জনপ্রিয় হলেও আইসল্যান্ডে এয়ারবিএনবি’র অনেক অবৈধ প্রপার্টি রয়েছে, আর ভাড়া বেশি হওয়ার কারণে আইসল্যান্ডের স্থানীয়দের কাছে এটি খুব কম জনপ্রিয়।

৫. ক্যাম্পিং করার পরিকল্পনা করুন আইসল্যান্ডে

ছবিঃ blogspot.com

আইসল্যান্ডে ক্যাম্পিং করার রীতি অনেক আগের। উপজাতীয় রীতিনীতি থেকে এখানে তৈরী হয়েছে প্রচুর ক্যাম্পসাইট। ক্যাম্পসাইটগুলো বিভিন্ন জায়গায় গড়ে তোলা হয়। যদি ক্যাম্পিং করার প্রবল ইচ্ছে থাকে তবে আইসল্যান্ডের ক্যাম্পিং হবে স্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা। এখানকার প্রতি টেন্টে প্রতি জনের প্রতি রাতে ভাড়া হয় মোটামুটি ১০ থেকে ২৩ ডলার। ওভারনাইট ট্যাক্স বলে একটা চার্জ আছে সেটাও খুব কম, ৩ ডলারের মতো।

অধিকাংশ ক্যাম্পসাইটগুলো আগে থেকে বুকিং নেয় না, কারণ জায়গার কোনো কমতি নেই সেখানে। তবে শীতকালে বেশিরভাগ ক্যাম্পসাইট বন্ধ থাকে, তাই আগে থেকে জেনে যাওয়া ভাল। ক্যাম্পের লোকেশন আর ক্যাম্পসাইট খোলা আছে কিনা জানতে পাশের ওয়েবসাইটটি যেতে পারেন, এখানে ৬০টিরও অধিক ক্যাম্পসাইটের যোগাযোগের মাধ্যম দেয়া আছে (en.camping.info/iceland/campsites)। উল্লেখ্য যে বড় টেন্ট, বিদ্যুৎ, গরম পানির ব্যবস্থা সহ টেন্টগুলোর ভাড়া সাধারণের চেয়ে বেশি হবে।

৬. ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিবেচনা করুন ভ্রমণের সম্ভাব্য সকল বিষয়

ছবিঃ ulduztourism.az

আইসল্যান্ড ভ্রমণকালে আপনি অবশ্যই জেনে যাবেন কোথায় কী আছে, কীভাবে ঘুরতে যাওয়া যায়, কত খরচ পড়ে ইত্যাদি। তবে যে পরিকল্পনাই করে থাকুন না কেন সবসময় নিজেকে প্রস্তুত রাখুন যে কোনো ধরনের বড় পরিবর্তনের জন্য। ভ্রমণের ক্ষেত্রে সবসময় প্ল্যান বি রাখা উচিত যাতে আইসল্যান্ডের মতো একটি দেশে গিয়ে ঘরে বসে মাছি না মারতে হয়।

কিছু বিষয় প্রথমেই মাথায় রাখুন যেমন গাইড নেবেন নাকি একা ঘুরবেন, গাড়ি ভাড়া করে ঘুরবেন নাকি এখানকার বাসই হবে আপনার ভ্রমণসঙ্গী। যদি গাইড নিয়ে ট্যুরে বের হোন তবে থাকা, খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদি সব গাইডই করিয়ে আনবে, তবে টাকা খরচ হবে বেশ ভালোভাবে। এর চেয়ে নিজে বিস্তারিত পড়াশোনা করে আসলে অনেক আরামে আর কম খরচে ঘোরাঘুরির পাঠটুকু চুকে যাবে।

৭. কিনে ফেলুন বাস পাসপোর্ট

ছবিঃ res.klook.com

আইসল্যান্ডের পাবলিক বাসগুলো শুধু সেখানেই থামবে যে জায়গাগুলোতে স্থানীয়রা যায়। বাসগুলো মোটেই পর্যটন স্থানে থামবে না, তাই মোটামুটি পর্যটন স্থানগুলো ঘুরে ফেলার জন্য কিনে ফেলা যায় বাস পাসপোর্ট। পর্যটন স্থান বলতেবাস গুলো রেইকজাভিকে যত জনপ্রিয় হাইংকিং শুরু করার জায়গা সবই ঘুরাবে।

এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় হাইকিং হলো লংগাভেগুর হাইকিং ট্রেইল, ফিমমভরদুহাস ইত্যাদি। ঘুরতে যাওয়ার মতো আরও অনেক জায়গা আছে যেমন স্কোগার, স্কাফটাফেল, ল্যান্ডমান্নালওগার, পস্মর্ক ইত্যাদি। বাসগুলো প্রতিটিতেই নিয়ে যাবে আবার নিয়ে আসবে। খরচও হবে একদম সাধ্যের মধ্যে।

উপরের উপায়গুলো বিশেষ করে আইসল্যান্ডের জন্য কার্যকর। আইসল্যান্ড যেহেতু বরফের দেশ, তাপমাত্রা সেখানে শূন্যের নিচে থাকে সবসময়। তাই থাকা, খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া করুন অত্যন্ত সাবধানতার সাথে। কারণ টাকা বাঁচাতে গিয়ে দেখা গেল তীব্র শীতের মধ্যে কেউ ক্যাম্পিং করে বসে আছে, তার জন্য সে রাতটা কাটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। তাই সবকিছু বিবেচনা করেই খরচের ব্যাপারে সাশ্রয়ী হোন একটু কায়দা করে যাতে এই টাকা বাঁচানো আপনার ভ্রমণে কোনো প্রভাব না ফেলে। ভ্রমণ হোক সুন্দর, প্রাঞ্জল আর স্মরণীয়।

ফিচার ইমেজ- thislittlelighttravels.files

var loaded = false; var loadFB = function() { if (loaded) return; loaded = true; (function (d, s, id) { var js, fjs = d.getElementsByTagName(s)[0]; if (d.getElementById(id)) return; js = d.createElement(s); js.id = id; js.src = "http://connect.facebook.net/en_US/sdk.js#xfbml=1&version=v3.0"; fjs.parentNode.insertBefore(js, fjs); }(document, 'script', 'facebook-jssdk')); }; setTimeout(loadFB, 0); document.body.addEventListener('bimberLoadFbSdk', loadFB); })();

Must Read

বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের খানিক ইতিহাস ও দর্শনীয় স্থানগুলো

বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত গৌড় নগর ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় অন্যতম বৃহৎ নগরী। এটি বাংলার প্রাচীন রাজধানী। আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত...

সুন্দরবনের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ

বাংলাদেশের মধ্যে যে কয়েকটি স্থান ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। এখানে সুন্দরী গাছের আবাসস্থল রয়েছে এবং এটি...

দ্বিতীয় দিন-দুপুরের আগে পৌঁছাতে হবে কালাপোখরি

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ওয়াশরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে, বসে আছি কিছুক্ষণ। তখনো ভোর হয়নি, হঠাৎ বামে তাকালাম। আমি যা দেখলাম পরের ৫ মিনিট আমি...