কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের মোহনীয় মায়া ও আকর্ষণীয় সূর্যাস্ত

বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও উল্লেখযোগ্য সমুদ্র সৈকত হলো পটুয়াখালি জেলার কলাপাড়া থানার লতাচাপলি ইউনিয়নে অবস্থিত সাগরকন্যা খ্যাত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করার উপযুক্ত স্থান কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। এখানে চমৎকার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায় বলে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে বেশ সুনাম ও সুখ্যাতি রয়েছে।
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং চওড়া প্রায় ৩.৫ কিলোমিটার। এখানে চোরাবালি নেই, তবে বালুকাময় সমুদ্র সৈকতে আছড়ে পড়া সাগরের ঢেউ পর্যটকদের হৃদয়ে আনন্দের দোলা জাগায়।

ছবিসূত্রঃ natunsomoy.com

সমুদ্র সৈকতের অফুরন্ত মায়া, ঝাউবনের অবাধ সবুজ, সারি সারি নারকেলের গাছের মায়া কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতকে দিয়েছে এক অনিন্দ্য সুন্দর রূপ যা দেখে দর্শনার্থীরা বিমোহিত না হয়ে পারে না। এছাড়া এখানে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন, বেলাভূমি। এখানে জেলেদের মাছ ধরা দেখা যায়, দেখা যায় ঘোড়ায় চড়া দর্শনার্থীদের, সাইকেলে ঘুরে বেড়ানো দর্শনার্থীদের। চাইলে যে কেউ এখানে সাইক্লিং করতে পারে এবং ঘোড়ায় চড়তে পারে।

ছবিসূত্রঃ Tourism Information

বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত নিয়ে বেশকিছু ধারণা লোকমুখে শোনা যায়। বলা হয়ে থাকে, আঠারো শতকে মোঘল শাসকরা আরাকানদের নিজস্ব অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করে দেয়। তারপর আরাকানরা এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে এবং বসতি স্থাপন করে। কিন্তু এই অঞ্চলে সুপেয় জলের অভাব ছিল। তাই তারা বিভিন্ন জায়গায় সুপেয় জল লাভের জন্য কূপ খনন করতে থাকে। আর এই কারণে পরবর্তীতে এর নামকরণ করা হয়েছে কুয়াকাটা।

ছবিসূত্রঃ vromonguide

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত মানুষকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। এছাড়াও এখানকার ঝাউবন পর্যটকদের হৃদয় হরণ করে। এখানে আরও রয়েছে ইকোপার্ক, জাদুঘর, বৌদ্ধমন্দির, কূপ, বৌদ্ধ বিহার, রাশ মেলা, ফাৎরার চর ইত্যাদি। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিমে ‘পায়রা’ ও ‘বিষখালী’ নামের দুটো নদী এবং পূর্বে ‘আগুনমুখো’ নামের একটি নদী রয়েছে। কুয়াকাটার অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি এখানে আসা দর্শনার্থীরা উপভোগ করতে পারে রাখাইন সম্প্রদায়ের সরল জীবনযাপণ ও আচার-অনুষ্ঠান।
ঝাউবনের গাছগাছালির মাঝে রয়েছে দারুণ পিকনিক স্পট যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার সাথে সাথে বনভোজনের অমৃত স্বাদ উপভোগ করা যায়। ব্যক্তিগত উদ্যেগে গড়া তোলা মিউজিয়াম ‘ফার্মস এন্ড ফার্মস’ এর সৌন্দর্য পর্যটকদের ভাবায়। মাথার উপর ছাদহীন বিশাল আকাশ, পায়ের নিচে মাটি ও ঘাসের সংসার, দিগন্ত বিস্তৃত লম্বা লম্বা নারিকেল গাছ ও অসংখ্য ফুলের সমারোহের মোহনীয় মায়ায় মুগ্ধ হয় পর্যটকরা।

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত

ছবিসূত্রঃ journey-for-better-life-bd.blogspot.com

সাগরকন্যা খ্যাত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের বুক চিরে যখন রক্তিম সূর্যের আলোকরশ্মি প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে তখন রাতের আঁধার কেটে ভোর আবির্ভূত হয়। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের চমৎকার সূর্যোদয় উপভোগ করা যায় ঝাউবন থেকে। ঝাউবন থেকে সুর্যাস্তও দেখা যায়। আবার কেউ কেউ বলেন, সবচেয়ে ভালো সূর্যোদয় দেখা যায় গঙ্গামতির বাঁক থেকে এবং সূর্যাস্ত দেখা যায় পশ্চিম সৈকত থেকে।
সূর্যাস্তের দৃশ্য চমৎকার! একবার যে সূর্যাস্তের অসীম সৌন্দর্য উপভোগ করে সে কখনো ভুলতে পারে না। মনে হয় জগতের সকল মায়া ছেড়ে আজকের মতো সন্ধ্যার আড়ালে লুকিয়ে যাচ্ছে গোধূলি লগ্নের ডুবন্ত সূর্য। সূর্যাস্তের সময় রঙের পরিবর্তনটাও স্পষ্ট বোঝা যায়।

সমুদ্র বিলাস ও গর্জন

ছবিসূত্রঃ amarnewsbd

সমুদ্র সৈকতের ঢেউ উপভোগ করলেও দিনের বেলা সমুদ্রের গর্জন চারপাশের হৈচৈ ও কোলাহলের কারণে শোনা যায় না। কিন্তু রাত যত বাড়তে থাকে সমুদ্রের গর্জন ও হাঁক তত বাড়তে থাকে। মাঝে মাঝে ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করে অকূল সমুদ্রের জলরাশি।

ছবিসূত্রঃ Beautiful Bangladesh In Frame

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের আশেপাশে বেশ কয়েকটি চর আছে। ইচ্ছে করলে সেই চরেও ঘুরতে পারে পর্যটকরা। চরগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ফাৎরার চর, সোনার চর, হাঁসার চর, গঙ্গামতির লেক, কটকা ইত্যাদি।
চরের মায়া ও সবুজের মাঝেও রয়েছে বিভিন্ন পশু ও পাখি। যেমন মোরগ, বনমোরগ, হাঁস, বানর, বুনো শুকর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। এছাড়া ক্রাব আইল্যান্ডে গেলে উপভোগ করা যায় লাল কাঁকড়ার ধীর পায়ে ছুটে চলার দৃশ্য। ট্রলার, জাহাজ কিংবা স্পিডবোটে করে যাওয়া যায় চর ভ্রমণে।

কেনাকাটার সুবিধা

কুয়াকাটায় যেসব দোকান রয়েছে তা থেকে অনেক নতুন ও আকর্ষণীয় পণ্য কেনাকাটা করা যায়। গুণে ও মানে ভালো দ্রব্যাদি পাওয়া যায় এখানে। এখানকার পণ্যগুলো বেশ ভিন্ন স্টাইলের ও সুন্দর। তবে দাম অপেক্ষাকৃত বেশি। দাম বেশি হলেও ক্রেতারা ভালো মানের পণ্য কেনে সর্বদা।
এছাড়াও এখানে রয়েছে শুঁটকি পল্লী। কুয়াকাটায় বেড়াতে গেলে অন্যরকম এক আকর্ষণ হলো শুঁটকি পল্লী। এখানে নানা জাতের মাছের শুঁটকি প্রস্তুত করা হয়। সামুদ্রিক মাছের শুঁটকিও পাওয়া যায় এখানে। ইলিশ, হাঙর, লইট্টা, রূপচাঁদা, কাঁচকি, শাপলাপাতা সহ অসংখ্য মাছের শুঁটকি সংগ্রহ করা যায় এখান থেকে।

যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে সরাসরি কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে বাস ছাড়ে। গাবতলী থেকে সাকুরা পরিবহন, দ্রুতি পরিবহন, সুরভী পরিবহন বাসে জনপ্রতি ৬৫০-৭০০ টাকা ভাড়া দিয়ে কুয়াকাটায় যাওয়া যায়। এছাড়াও বিআরটিসি বাস প্রতিদিন সকাল ও রাতে কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে যায়।
কুয়াকাটা যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো হলো নদীপথ। প্রথমে ঢাকা থেকে বরিশাল, তারপর বরিশাল থেকে কুয়াকাটা যাওয়া যায় আরামে। ঢাকার সদরঘাট থেকে বরিশালের লঞ্চে রাতে উঠলে সকালে বরিশাল পৌঁঁছাতে পারবেন। ডেকে জনপ্রতি ভাড়া নেবে ১৫০-২০০ টাকা। তবে কেবিনের ভাড়া বেশি। প্রথম শ্রেণীর কেবিন সিঙ্গেল ও ডবল ভেদে ভাড়া খরচ হবে ৭০০-৩৫০০ পর্যন্ত। বরিশাল লঞ্চঘাটে নেমে সেখান থেকে রূপাতলী বাস স্ট্যান্ড যেতে হবে। সেখান থেকে কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে বাস ছাড়ে। ভাড়া নেবে জনপ্রতি ১৮০/২৫০ টাকা। সময় লাগবে প্রায় ৩ ঘণ্টা।

থাকার ব্যবস্থা

ছবিসূত্রঃ Booking.com

কুয়াকাটায় অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। মানের ভিন্নতা ও শ্রেণী অনুযায়ী খরচপাতির ভিন্নতা দেখা যায়। এসব হোটেলে থাকার ব্যয় ৪০০-৫,০০০ টাকাও হয়ে থাকে। তবে শেয়ার করেও থাকা যায়। অফসিজনে কুয়াকাটায় গেলে আগে থেকে হোটেল বুক করা লাগে না, কিন্তু পর্যটন মৌসুমে হোটেল বুক করে না গেলে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়।
ফিচার ইমেজ- pinimg.com

Must Read

নয়ন জুড়াতে পারেন দারুচিনি দ্বীপের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে

“বাংলার মুখ দেখিয়াছি তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর” – কবি জীবনানন্দ দাশ হৃদয়ের গভীর থেকে চয়ন করেছেন এই কথা যা বাংলাদেশের...

শৈলপ্রপাতের কত রূপ!

বান্দরবান শহর থেকে নীলগিরি, থানচি কিংবা রুমার দিকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে যাত্রা শুরু করে, ৮ কিলোমিটার সামনে গেলেই পাহাড়ের সবুজের ভেতর থেকে কানে আসবে...

প্যারাগ্লাইডিং করে আকাশে উড়বার জন্য বিশ্বে সেরা যে স্থানগুলো

মানুষের মন বড় বেশিই বৈচিত্র্যময়। তার কখনো আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে হয়, কখনো ইচ্ছে হয় মেঘে ভেসে বেড়াতে, কখনোবা তার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয় সমুদ্রের...