চট্টগ্রামের বিখ্যাত একটি মসজিদ ও একটি বিখ্যাত মন্দির কথন

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের অত্যন্ত সুন্দর একটি স্থান। বন, নদী, ঝর্ণা, লেক, পাহাড়, সমুদ্র ইত্যাদি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন জায়গাটির প্রতি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে তেমনি আকৃষ্ট করে মানুষের তৈরি কিছু চমৎকার স্থাপনার মাধ্যমেও। মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মতো জায়গাটিতে ছড়িয়ে আছে চমৎকার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কিছু নিদর্শন। সেসবের উল্লেখযোগ্য দুটি স্থানের মধ্যে রয়েছে মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জনপ্রিয় তীর্থস্থান ‘চন্দ্রনাথ মন্দির’।

দুটি ভিন্ন ধর্মের ভিন্ন দুটি প্রার্থনার স্থানের পুরনো ইতিহাস ও স্থান দুটির চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যের খানিকটা বর্ণনা জেনে নিন, যাতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে পরবর্তী ভ্রমণ পরিকল্পনা করলে জায়গা দুটিকে রাখতে পারেন আপনার তালিকায়।

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ:

আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ; source: www.jagonews24.com

চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ইসলামি স্থাপনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি স্থাপনা হলো এই আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। মসজিদটি মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের গল্পের সাথে সম্পর্কিত। কথিত আছে, এ কেল্লাটি এক সময় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের গুপ্তস্থান ছিল। জলদস্যুরা তাদের গুপ্ত আলোচনা ও লুট করা সম্পদ রাখার কাজে ব্যবহার করতো এই জায়গাটিকে। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের তৎকালীন মোগল শাসনকর্তা শায়েস্তা খাঁর ছেলে উমেদ খাঁ এ কেল্লার ভেতরে প্রবেশ করলে তখন থেকে এর নাম দেয়া হয় ‘আন্দরকিল্লা’।
পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিজয়ের পর, চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে জলদস্যুদের সেই গুপ্তস্থানটিতে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সে সময় মসজিদটির নামকরণ করা হয় ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’।
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের স্থাপত্য ও গঠন মোগল রীতি অনুযায়ী তৈরি। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উপরে ছোট্ট একটি পাহাড়ের ওপর মসজিদটির অবস্থান। নকশা অনুযায়ী মূল মসজিদটি ১৮ গজ (১৬ মিটার) লম্বা, ৭.৫ গজ (৬.৯ মিটার) চওড়া এবং প্রতিটি দেয়াল প্রায় ২.৫ গজ (২.২ মিটার) পুরু। পশ্চিমের দেয়ালটি পোড়া মাটির তৈরি এবং বাকি তিনটি দেয়াল পাথরের তৈরি। মসজিদের ছাদের মাঝখানে রয়েছে একটি বড় গম্বুজ এবং আরো দুটি ছোট গম্বুজ দ্বারা স্থানটি আবৃত।

অসাধারণ আন্দরকিল্লা মসজিদ; source: returnofislam.blogspot.com

১৬৬৬ সালে নির্মিত এর চারটি অষ্টভূজাকৃতির বুরুজগুলোর মধ্যে পেছনের দিকে দুটি বুরুজ বর্তমানে বিদ্যমান। মসজিদটির পূর্বে তিনটি, উত্তর এবং দক্ষিণে একটি করে মোট ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদের ভেতরে তিনটি মেহরাব রয়েছে। তবে মাঝের সবচেয়ে বড় মেহরাবটিই এখন ব্যবহৃত হয়।
মসজিদটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তৈরি। এর কারুকাজ ও নির্মাণশৈলী প্রশংসনীয়। সুন্দর এই নির্দশনটি দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসেন পর্যটকরা। শুধু মুসলিমই নয়, পুরনো ইতিহাস ও পুরনো স্থাপনা নিয়ে আগ্রহী পর্যটকদের প্রচুর ভিড় হয় এ স্থানটিতে।

যেভাবে যাবেন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদটি দেখতে:

আন্দরকিল্লার সৌন্দর্য; source: archive1.ournewsbd.net

ঢাকা থেকে প্রথমেই পৌঁছাতে হবে চট্টগ্রাম। ঢাকার কমলাপুর বাস টার্মিনাল ও সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ড থেকে বেশ কিছু বাস ছেড়ে যায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে। ‘সৌদিয়া’, ‘গ্রীনলাইন’, ‘সিল্ক লাইন’, ‘সোহাগ’, ‘বাগদাদ এক্সপ্রেস’, ‘ইউনিক’ ইত্যাদি বাসগুলোতে যেতে পারবেন। এসি বাসে যেতে চাইলে ভাড়া পড়বে ৮৫০ টাকা থেকে ১১০০ টাকা। আর নন-এসি বাসে ভাড়া পড়বে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। চট্টগ্রাম পৌঁছে, চট্টগ্রাম থেকে যেতে হবে চাটগছা। চাটগছা পৌঁছে স্থানীয়দের কাছে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে এই বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদটি।

চন্দ্রনাথ মন্দির:

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় মন্দির; source: bdhaat.com

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি মন্দির যা ‘চন্দ্রনাথ মন্দির’ নামে পরিচিত। এটি অন্যতম বিখ্যাত শক্তিপীঠ। এ মন্দিরটির জন্য এলাকাটি হিন্দুদের বিশাল এক তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে। এখানকার সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দিরটি অনেক সুন্দর। গাছপালা ঘেরা সবুজের ভিড়, পাহাড়ের সৌন্দর্য, সুন্দর বিশালাকার আকাশ দেখার আলাদা অনুভূতি- সব মিলিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় এই মন্দিরটি অনেক পবিত্র অনুভূতি দেয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের। জায়গাটির আলাদা সৌন্দর্য টেনে আনে ভিন্ন ধর্মের মানুষদেরও।
চন্দ্রনাথ মন্দির ছাড়াও জায়গাটিতে রয়েছে আরো অসংখ্য মন্দির ও পূজামণ্ডপ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বড়বাজার পূজা মন্ডপ, ক্রমধেশ্বরী কালী মন্দির, ভোলানন্দ গিরি সেবাশ্রম, কাছারী বাড়ী, শনি ঠাকুর বাড়ী, প্রেমতলা, শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রাহ্মচারী সেবাশ্রম, শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, গিরিশ ধর্মশালা, দোল চত্বর, এন,জি,সাহা তীর্থযাত্রী নিবাস, তীর্থ গুরু মোহন্ত আস্তানা, বিবেকানন্দ স্মৃতি পঞ্চবটি, জগন্নাথ আশ্রম, শ্রীকৃষ্ণ মন্দির, মহাশ্মশানভবানী মন্দির, স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিগয়াক্ষেত, জগন্নাথ মন্দির, বিরুপাক্ষ মন্দির, পাতালপুরী, অন্নপূর্ণা মন্দির।

চন্দ্রনাথ মন্দিরের পথে; source: bokaporjotok.blogspot.com

তবে চন্দ্রনাথ মন্দিরটি অধিক জনপ্রিয় স্থানীয় সহ ভ্রমণ প্রিয় মানুষদের কাছে। পাহাড় বেয়ে পাহাড়ের সর্বোচ্চ অংশে অবস্থিত এই মন্দিরে পৌঁছানো অনেকটা রোমাঞ্চকর যাত্রাই বটে। তবে আশেপাশের সৌন্দর্য ও ভ্রমণের নেশা পথের পরিশ্রমকে মন অবধি পৌঁছানোর সুযোগ দেবে না। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেকটা মুগ্ধতা ঘিরে নেবে আপনাকে।

যেভাবে যাবেন চন্দ্রনাথ মন্দিরটি দেখতে:

চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাওয়ার সিঁড়ি; source: bokaporjotok.blogspot.com

প্রথমেই আপনাকে বাসে করে চট্রগ্রামের সীতাকুণ্ডে পৌঁছাতে হবে। ঢাকা থেকে একইভাবে ‘সৌদিয়া’, ‘গ্রীনলাইন’, ‘সিল্ক লাইন’, ‘সোহাগ’, ‘বাগদাদ এক্সপ্রেস’, ‘ইউনিক’ ইত্যাদি বাসগুলোতে যেতে পারবেন সীতাকুণ্ডে। এসি বাসে কিংবা নন-এসি বাসের ক্ষেত্রে ভাড়া ৪০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে। সেখানকার স্ট্যান্ড থেকে সীতাকুণ্ড বাজারে পৌঁছাবেন। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে ৩.৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড়। রিকশায় অথবা পায়ে হেঁটে যেতে পারবেন পাহাড়ে।
ফিচার ইমেজ- Youtube.com

Must Read

বান্দরবান পর্ব

বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ ধরে রেখেছে এদেশের সবচেয়ে সুন্দর অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে রয়েছে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি সহ আরো অনেক জেলা।...

স্বপ্নপুরির জগতে একটি দিন

সাধারণ পার্কের সঙ্গে থিম পার্কের পার্থক্য হচ্ছে, এটি একটি থিম বা বিষয়বস্তুর ওপর তৈরি করা হয়। সেই থিমকে কেন্দ্র করে এর স্থাপনা এবং রাইডগুলো...

যে গিরিতটের নীলিমায় হারিয়ে যাওয়া যায় অনায়াসেই

বান্দরবান যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছিল দু’মাস আগ থেকে। কিন্তু দিন তারিখ ঠিক হচ্ছিল না কিছুতেই। দু’দিন পর পর নীল আর ইমুর কাছে ভাঙা ক্যাসেট প্লেয়ার...