চোখ জুড়ানো সবুজে ঘেরা আগুনিয়া চা বাগানে এক বিকেল

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। বঙ্গোপসাগরের নিকটে অবস্থিত এই স্থানটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একটি স্থান। নদী, পাহাড়, সমুদ্র সৈকত, লেক, ঝর্ণা সহ নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ছেয়ে থাকা জায়গাটি পর্যটকদের প্রিয় একটি স্থান হয়ে আছে বহু বছর ধরে। বর্তমানে ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের সংখ্যাটা বেড়েই চলেছে এ জায়গাটি ঘিরে। চট্টগ্রামে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য দর্শীয় স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি স্থান ‘আগুনিয়া চা বাগান’।

সবুজে ঘেরা চা বাগান; source: Ispahani Mirzapore Tea

চা বাগান, যেখানে চা গাছের চাষ হয়। চা গাছের পাতাকে চা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি একটি জনপ্রিয় পানীয়। চা বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। রপ্তানি আয়ের অন্যতম উৎসও হচ্ছে চা। তবে চায়ের এই পাতা ও গাছের ভিড়ে ছড়িয়ে থাকে অসাধারণ এক সৌন্দর্য, যা চোখ ও মনকে অনেকটা প্রশান্তি দেয়। এমনই এক অসাধারণ সৌন্দর্য ঘেরা একটি স্থান চট্টগ্রামের আগুনিয়া চা বাগান।

চোখ জুড়ানো সবুজ; source: Foreign Office Blogs

এই আগুনিয়া চা বাগানটি চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় অবস্থিত। প্রায় ৩,০০০ একর জায়গার উপরে বিশাল এই চা বাগানটি অসাধারণ এক সৌন্দর্য নিয়ে ছড়িয়ে আছে রাঙ্গুনিয়ায়। এখানকার চা বাগানটিতে প্রায় ১,৫০০ কর্মচারী কাজ করেন। এই চা বাগানটি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাংগুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়ন ও কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নে অবস্থিত এই বাগানটি শুধুমাত্র একটি চা বাগানই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সমৃদ্ধ একটি স্থানও। এটিকে শুধু চা বাগান হিসেবেই দেখে না এখানকার কর্মচারী কিংবা স্থানীয়রা। সবুজে ঘেরা জায়গাটি ভিন্ন অর্থও বহন করে সবার কাছে।

চা গাছের পাতা; source: trekearth.com

অনেকের কাছেই প্রিয় হয়ে আছে সবুজে ঘেরা এই বিশাল স্থানটি। পাশাপাশি চায়ের যোগান দিয়ে বাণিজ্যিকভাবেও দেশে অবদান রাখছে বাগানটি। অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের জীবিকা নির্বাহে ভিন্নভাবে ভূমিকা রাখছে। শুধু তাই নয়, দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে ভূমিকা রাখছে পর্যটনশিল্পের প্রসারের ক্ষেত্রেও।
এই আগুনিয়া চা বাগানটি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ স্থান। স্থানীয়রা প্রায় প্রতি বিকেলেই এখানটায় ঘুরতে আসে। পুরো জায়গাটি জুড়ে সবুজের সমারোহ। যতদূর চোখ যায় দেখে মনে হয় যেন ছড়িয়ে আছে সবুজের উঁচু প্রাচীর, যা অনেকটা ভালো লাগা নিয়ে চোখ জোড়াকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

চা পাতা তোলার দৃশ্য; source: dhakacourier.com.bd

বিশাল এই সবুজের ভিড় কার না ভালো লাগবে! বিকেলের ফুরফুরে বাতাসের সাথে এমন সবুজে ঘেরা স্থানে কাটানো মুহূর্ত অনেকটা আলাদা হয়েই স্মরণ হবে পরবর্তী সময়গুলোতে। শুধু স্থানীয়দের ভিড়ই না, জায়গাটি অন্যান্য অঞ্চলের পর্যটকদেরও আকর্ষণে রয়েছে এবং সারা বছর অসংখ্য বিদেশী পর্যটকদেরও আসা-যাওয়া চলতে থাকে জায়গাটিতে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়ম নগর স্টেশন থেকে যে কোনো পরিবহন যোগে কাপ্তাই বড়ইছড়ি রোড হয়ে এই আগুনিয়া চা বাগানে যাওয়া যায়। পর্যটকদের কথা বিবেচনা করে বেশ কিছু হোটেল চালু হয়েছে এখানকার বিভিন্ন স্থানে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রোয়াজারহাট এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন বেশ কিছু হোটেল আছে, যেখানে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে স্বল্প খরচেই।

সবুজ শ্যামল চা বাগান; source: dreamstime.com

তাই যদি দূর থেকে বেড়াতে আসেন এবং এখানকার আশেপাশে কোনো নিকটাত্মীয় না থাকে তবে চিন্তার কিছু নেই, অল্প খরচে ভালোভাবেই থাকার ব্যবস্থা যুগিয়ে ফেলতে পারবেন। এছাড়াও রোয়াজারহাট এলাকায় অসংখ্য রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেখানে সকাল, দুপুর কিংবা রাত যেকোনো বেলার খাবারই খেয়ে নিতে পারবেন তৃপ্তির ঢেকুর তুলে। দামও থাকবে সাধ্যের মধ্যেই।

যেভাবে যাবেন আগুনিয়া চা বাগান ভ্রমণে:

ঢাকা থেকে বাসে যেতে চাইলে:

চট্টগ্রাম মহানগরীর বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে মরিয়মনগর চৌমুহনীর দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার ও মরিয়মনগর চৌমুহনী থেকে আগুনিয়া চা বাগানের দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সদর থেকে এ চা বাগানের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার।
আগুনিয়া চা বাগানে যেতে চাইলে প্রথমেই আপনাকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। কমলাপুর বাস টার্মিনাল থেকে বিআরটিসিতে যেতে পারবেন। যদি সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ড থেকে যেতে চান তবে ‘সৌদিয়া’, ‘গ্রীনলাইন’, ‘সিল্ক লাইন’, ‘সোহাগ’, ‘বাগদাদ এক্সপ্রেস’, ‘ইউনিক’ ইত্যাদি বাসগুলোতে যেতে পারবেন। এসি বাসে যেতে চাইলে ভাড়া পড়বে ৮৫০ টাকা থেকে ১১০০ টাকা। আর এস আলম, সৌদিয়া, ইউনিক, শ্যামলী, হানিফ, ঈগল প্রভৃতি পরিবহনের সাধারণ বাসে যেতে চাইলে ভাড়া পড়বে ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা।
চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই বাস যোগে মরিয়মনগর চৌমুহনী এলাকায় নামতে হবে। সেখানকার বাস স্ট্যান্ড থেকে রিজার্ভ সিএনজি চালিত অটোরিক্সায় আগুনিয়া চা বাগানে যাওয়া যায়। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে সিএনজি চালিত অটোরিক্সার মাধ্যমে একইভাবে আগুনিয়া চা বাগানে যাওয়া যায়।

ঢাকা থেকে ট্রেনে যেতে চাইলে:

ট্রেনে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বেশ কিছু ট্রেন চলাচল করে বিভিন্ন সময়ে। সেক্ষেত্রে আপনাকে আগেই কমলাপুর স্টেশন থেকে ট্রেনের টিকেট কেটে রাখতে হবে। মহানগর প্রভাতী চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ে সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে, চট্টলা এক্সপ্রেস ঢাকা ছাড়ে সকাল ৯টা থেকে ৯টা ২০ মিনিটের মধ্যে, মহানগর গোধূলি ঢাকা ছাড়ে বিকেল ৩টায়, সুবর্ণ এক্সপ্রেস ঢাকা ছাড়ে বিকেল ৪টা ২০ মিনিট থেকে ৫টার মধ্যে, তূর্ণা ঢাকা ছাড়ে রাত ১১টায়। ট্রেনে যেতে ভাড়া পড়বে ১৬০ টাকা থেকে ১১০০ টাকা।
চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছে সেখান থেকে সিএনজি বা অটো রিক্সা যোগে যেতে পারবেন আগুনিয়া চা বাগান।

Must Read

নয়ন জুড়াতে পারেন দারুচিনি দ্বীপের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে

“বাংলার মুখ দেখিয়াছি তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর” – কবি জীবনানন্দ দাশ হৃদয়ের গভীর থেকে চয়ন করেছেন এই কথা যা বাংলাদেশের...

শৈলপ্রপাতের কত রূপ!

বান্দরবান শহর থেকে নীলগিরি, থানচি কিংবা রুমার দিকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে যাত্রা শুরু করে, ৮ কিলোমিটার সামনে গেলেই পাহাড়ের সবুজের ভেতর থেকে কানে আসবে...

প্যারাগ্লাইডিং করে আকাশে উড়বার জন্য বিশ্বে সেরা যে স্থানগুলো

মানুষের মন বড় বেশিই বৈচিত্র্যময়। তার কখনো আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে হয়, কখনো ইচ্ছে হয় মেঘে ভেসে বেড়াতে, কখনোবা তার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয় সমুদ্রের...