দ্বিতীয় দিন-দুপুরের আগে পৌঁছাতে হবে কালাপোখরি

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ওয়াশরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে, বসে আছি কিছুক্ষণ। তখনো ভোর হয়নি, হঠাৎ বামে তাকালাম। আমি যা দেখলাম পরের ৫ মিনিট আমি আমার চোখ সরাতে পারি নি, দেখলাম দূর পাহাড়ে সোনালি গোলাপ আস্তে আস্তে আভা ছড়াচ্ছে। কী যে মনোমুগ্ধকর সে সূর্যোদয়, তা স্বচক্ষে না দেখলে বোঝানো সম্ভব না!
একটা পুরো দিগন্ত আমার চোখের সামনে ছিল, পাহাড়ের সীমানা পেরিয়ে বহু দূর আলো চলে যায় এমন দিগন্তে। টিম মেম্বারদের চেঁচামেচিতে সম্বিৎ ফিরে পেলাম, বুঝলাম এতক্ষণ আমি ওয়াশরুমে ছিলাম। একে একে সবাই ফ্রেশ হয়ে বসে গেলাম নাস্তার টেবিলে। গত রাতেই একদল পর্যটক দেখেছিলাম গোহাটি থেকে এসেছে। তাদের মধ্যে দুটো ফ্রেঞ্চ যুগলও ছিলেন। আস্তে আস্তে বিশাল খাবার টেবিল সরগরম হয়ে উঠলো হরেক দেশের মানুষে।

তুমলিং এ দিঘন্তখেলা, ছবিঃ টিম মেম্বার ইমন ভাই

ভিনদেশে এই ব্যাপারটা আমি খুব উপভোগ করি, নানান দেশের সংস্কৃতি একটা খাবার টেবিল বা আগুন পোহানোর চিমনিতে পূর্ণতা পায়। সান্দাকফু ট্রেকের দিনগুলোতে আমরা খুব ভারী খাওয়া দাওয়া করিনি। সকালে দুটি রুটি-ডিম, দুপুরে নুডুলস, রাতে নুডুলস খেয়েই পার করেছি ৪ দিন। আজকে আমাদের গন্তব্য ১৬ কিলোমিটার দূরের কালাপোখরি গ্রাম।
নাস্তা করে যখন কটেজ থেকে বের হলাম তখন ঘড়িতে সাড়ে ৬টা ৫০ বাজে। চোখের সামনে সূর্যের আভায় জ্বলজ্বল করছে হিমালয় পরিবার। আমাদের মতো ভাগ্য আর আকাশের অবস্থা ভালো থাকলে তুমলিং থেকে দেখা হয়ে যাবে হিমালয়ান রেঞ্জ। কিন্তু আমাদের আরো কাছ থেকে দেখতে হবে, এত কাছ থেকে যে কাঞ্চনজঙ্ঘার ঠাণ্ডা বাতাস যেন শরীরে লাগে!

তুমলিং থেকে হিমালয় পরিবার, ছবিঃ লেখক

তাই আস্তে আস্তে শুরু করলাম হাঁটা। ঘড়ির কাঁটা তখন আটটার কাছাকাছি। আমাদের অনেক আগেই সেই ফ্রেঞ্চযুগল সহ ৩০ জনের দলটি রওনা দিয়েছে। তুমলিং থেকে একটু এগোলেই সিংগালিলা ন্যাশনাল পার্ক পড়ে, আবারো পাসপোর্ট এন্ট্রি করাতে হয় এখানে। ঝলমলে সকালে নেপাল আর ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে হাঁটতে লাগলাম আমরা।

তুমলিং থেকে কালাপোখরির পথ, ছবিঃ টিম মেম্বার দীপ সেন

চারপাশে গেরুয়া রঙের ঘাস-পাতা আর তুষারপাতের চিহ্ন দেখতে লাগলাম। কয়েকদিন আগেই নাকি বেশ ভালো তুষারপাত হয়েছে এখানে, অথচ আজকের আবহাওয়া দেখলে তেমন মনেই হয় না। পাথুরে রাস্তায় হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল, সাথে খাড়া পথ তো আছেই। কানে হেডফোন লাগিয়ে ফোনটা রেখে দিলাম ব্যাগের পানির বোতল যেখানে রাখে সেখানটায়। একদম নমনীয় উলের প্যান্ট পরা ছিলাম বলে শরীরের নিচের অংশে স্বস্তি নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না, সমস্যা ছিল উপরের অংশে।
কয়েক স্তরে কাপড় তারপর আবার একটা ডাউন জ্যাকেট শরীরকে ভারী করে দিচ্ছিল। খুলে ব্যাগে ঝোলানোরও জো নেই, সুন্দর রৌদ্রদীপ্ত দিনে কনকনে ঠাণ্ডা লাগে তাহলে। হাত-মোজা পরলে হাত ঘেমে যায়, খুলে ফেললে হাত জমে যায়। কী করব এই দোটানায় শ্বাসকষ্টও হয় মাঝে মাঝে, এই বুঝি ইনহেলার লাগলো! মাফলারটা হারালাম যাওবাড়ির ঠিক আগেই।

যাওবাড়ির আগে, ছবিঃ লেখক

যাওবাড়ি থেকে আরো ৮-৯ কিলোমিটার দূরে কালাপোখরি। এখানেও পাসপোর্ট এন্ট্রি করতে হয়। আসলে এই পাসপোর্ট এন্ট্রি করা হয় মূলত ট্রেকারদের অবস্থান জানতে, মানেভঞ্জন থেকে প্রতিনিয়ত ট্রেকারদের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। কোনো দল যদি সান্দাকফু গিয়ে ৩-৪ দিনের মধ্যে ফিরে না আসে তবে মানেভঞ্জন থেকে উদ্ধারকর্মী পাঠানো হয় পাহাড়ে।
যাই হোক, যাওবাড়ি থেকে পাসপোর্ট খাতায় তুলে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। সোম বাহাদুরজী বলল সামনের ২ কিলোমিটার কোনো খাড়া পথ নেই, শুধু ঢালু। গা ছেড়ে দৌঁড়ে নামতে লাগলাম সবাই, ঠিক যেন বুনো মোষের দল। আধ ঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টা টানা নামার পর গেইরিবাসে পৌঁঁছালাম। প্রায় দুই হাজার ছয়শ মিটার উচ্চতার এ গ্রামে পাসপোর্ট এন্ট্রি করিয়ে ঢুকে পড়লাম এক নেপালি কটেজে। ডাউন জ্যাকেটটা খুলতেই ধোঁয়া বের হতে থাকলো গা থেকে, বুঝলাম তাপমাত্রা নেহাতই কম নয়।

গেইরিবাস, ছবিঃ টিমমেম্বার আসিফ

সকাল সাড়ে এগারোটায় গেইরিবাস থেকে আবার হাঁটা শুরু করলাম। সান্দাকফুর পুরো ট্রেকিং পথে গেইরিবাসের পরের পথটুকু আমার কাছে সবসময় দূঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে। টানা ৩ কিলোমিটার একদম খাড়া পথ, সিঁড়ি আর এতটুকুও সমতল জায়গা নেই। উঠছি তো উঠছি। আমার বাকি টিম মেম্বাররা আগে চলে গেছে। তরতর করে উঠে গেছে তারা। আমি পারছি না, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে খুব।
অনেক কষ্টে ১ কিলোমিটার পথ উঠে এলাম, শরীর ছেড়ে দিয়েছে। চোখের সামনে ছোট একটা সিঁড়িপথ দেখলাম, বুঝলাম সামনে আরো দূঃখ আছে কপালে। ঘাম দিয়ে কাঁপুনি উঠলো শরীরে, জ্যাকেটটা এক টানে খুলে ফেললাম। ব্যাগটা শরীর থেকে ছাড়িয়ে ঠিক দশ মিনিট বিশ্রাম নিলাম।

বসে পড়লাম শেষমেষ, ছবিঃ দীপ

তারপর উঠে আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলাম কিন্তু পারলাম না। বুকের দপদপানিতে জীবনে প্রথম মৃত্যুভয় কাজ করা শুরু করলো, মনে পড়লো অনেক কাছের মানুষের কাছে ফিরে যেতে হবে আমাকে। ইনহেলারটা সেখানেই লেগেছিল, তাও দু’বার। সবাই দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করেছে আমার জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত ঠিক না হয়েছি। ইনহেলার নেয়ার পর অনেকটা সুস্থ বোধ করা শুরু করলাম, আবার হাঁটা শুরু করলাম। মনে মনে জপতে লাগলাম, “পারতেই হবে আমাকে”।
একসময় শেষ হলো সেই খাড়া তিন কিলোমিটার। উপর থেকে পুরো অঞ্চলটা চোখের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে, ক্লান্তি আর শ্বাসকষ্ট হুট করেই কমে গেল। থামলাম না, দুপুর দুটোর আগে কালাপোখরি পৌঁছাতে হবে। পাহাড়ে দুপুর দুটোর পর চেহারা একদম পাল্টে যায়, ঝলমলে আবহাওয়া রূপ নেয় তাণ্ডবী ঝড়ো বাতাসে।
সিঁড়ি ভেঙে, রাস্তায় হেঁটে, গেরুয়া ঘাস মাড়িয়ে চলতে লাগলাম সারি বেঁধে। মাঝখানের এই পথটা সবচেয়ে সুন্দর ছিল, দূরের বরফমাখা পাহাড় আর আলো-ছায়ার পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম বেঁচে থাকাটা সত্যিই সুন্দর। একমাত্র এই পথে একদম জমে যাওয়া সাদা বরফ পেলাম পাহাড়ের গায়ে। দেখতে দেরি হলেও ছবি তুলতে দেরি হলো না।

নেপালি কটেজের ঐতিহ্য, ছবিঃ লেখক

তখনো জানতাম না আর মাত্র দুই কিলোমিটার আছে কালাপোখরী। ঘড়িতে দুপুর আড়াইটা বাজে। আজকে তেমন ঝড়ো বাতাস শুরু হয়নি এখনো। সোম বাহাদুরজী জানালেন বেশ হেঁটেছি, অনেক দ্রুত হেঁটেছি নাকি আমরা। এটা বলার কারণ আছে, ৩০ জনের যে গ্রুপটা আমাদের এক ঘণ্টা আগে হাঁটা শুরু করেছিল, সেখানে তাদের পেরিয়ে দৌড়ে চলে এসেছি আমরা। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, খুব হতাশ হয়েছে আমাদের দেখে।
বাহাদুরজীর ২ কিলোমিটার খবরের খুশিতে আরো জোরে পা ফেলতে লাগলাম, মাঝখানে নেপালের এক জায়গায় থামতে হয়েছিল। নুডুলস খাওয়া হয়েছিল সেখানটায়। সেই নুডুলসেরই ফল এই জোরে হাঁটা। পাহাড়ে এসে দেখলাম নুডুলস পেটে পড়লে আমার গতি বেড়ে যায়, ডান-বাম না তাকিয়ে হাঁটতে থাকি তো হাঁটতেই থাকি। সেই খাড়া পথের পরে একটু বিশ্রাম নিয়ে আর থামিনি আমরা। খাড়া পথের পরের পাঁচ-সাড়ে পাচঁ কিলোমিটার টানা হেঁটেছি আমরা।

নেপালি কটেজ থেকে ফের পা বাড়ালাম, ছবিঃ লেখক

হঠাৎ জলের শব্দ শুনতে পাই, এত উচুতে জল কোথায়? দেখতে পেলাম আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে কালাপোখরির জলের উপর বয়ে যাচ্ছে বাতাস আর সেই বাতাসে দোল খাচ্ছে রঙ-বেরঙের কাপড়। অবশেষে পৌঁছালাম কালাপোখরি।
কালাপোখরি বৌদ্ধদের পবিত্র গ্রাম। এখানে কালো জলের এই কালাপোখরি হ্রদ স্থানীয় বৌদ্ধদের অতি পবিত্র এবং ঐতিহ্যবাহী স্থান। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এখানকার নিয়ম হলো, স্থানীয়রা তাদের পাপ কাপড়ে লিখে হ্রদের উপর সুতা দিয়ে টানিয়ে দেয়। বাতাসে দোল খেতে খেতে প্যাঁচ খোলে সুতার আর সেই পাপ সমেত কাপড় পানিতে মিলিয়ে যায়। এভাবেই নিজেদের পাপ মোচন করেন স্থানীয়রা।

কালাপোখরি হ্রদ, ছবিঃ সোম বাহাদুর জী

পান্ডেম কটেজে উঠে পড়লাম দেরি না করে। জুতো খুলতেই বুঝলাম পা কেটেছে টানা নিচে নামার সময়। হাতমুখ ধুতে গেলাম, জলের তাপমাত্রা ঠাহর করে শুধু পা ধুয়ে চলে আসলাম। তখনো আকাশ পরিষ্কার। পাহাড়ের কোলে মেঘেরা আছড়ে পড়ছে, ঠিক যেমন সমুদ্রতটে ঢেউ আছড়ে পড়ে। খাবার বানাতে বলে একটু বেরিয়ে আসলাম আশপাশ থেকে।
এক-দেড় ঘণ্টা পর ৩০ জনের সেই টিম কালাপোখরিতে পৌঁছাল। বিকেল চারটায় ফ্রাইড রাইস দিয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে রাতের খাবার হিসেবে নুডলস বানাতে বলে রুমে গেলাম। বাইরে তখন বাতাসের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে, শীতে হাত জমে যাচ্ছিল।

কালাপোখরি, ছবিঃ লেখক

এদিকে শরীর প্রচন্ড ক্লান্ত, বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম চলে এলো, ঘুম ভাঙল কটেজের লোকদের ডাকে ঠিক সাতটায়। এখানে আবার রাত ১০টার পর বিদ্যুৎ থাকে না। নুডলস খেয়ে গল্প শুরু করলাম। সবারই অনেক ব্যক্তিগত কষ্টের কথা জানতে পারলাম, বুঝলাম পাহাড় এই মানুষগুলোকে উজাড় করতে শেখাচ্ছে। পরিস্থিতি হালকা করতে ভূতের গল্প শুরু করতে চাইলাম, কয়েকজন ভয়ে প্রতিবাদ করে উঠলো। এই খুনসুটিতে কখন যে চোখ বুজে ঘুম চলে আসলো কেউই বুঝিনি। আগামীকালের আবার ট্রেকের ভয়ে হয়তো!

(চলবে…)

প্রথম পর্ব: https://tripzone.xyz/sandakphu-trek-day-1
ফিচার ইমেজ- nationalgeographic.com

var loaded = false; var loadFB = function() { if (loaded) return; loaded = true; (function (d, s, id) { var js, fjs = d.getElementsByTagName(s)[0]; if (d.getElementById(id)) return; js = d.createElement(s); js.id = id; js.src = "http://connect.facebook.net/en_US/sdk.js#xfbml=1&version=v3.0"; fjs.parentNode.insertBefore(js, fjs); }(document, 'script', 'facebook-jssdk')); }; setTimeout(loadFB, 0); document.body.addEventListener('bimberLoadFbSdk', loadFB); })();

Must Read

জেনে নিন খুঁটিনাটি

ভ্রমণে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর কারণ ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারের মাধ্যমে অনেকগুলো বিষয় খুব সহজে করা যায়, যার ফলে আপনার...

রাশিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

সেন্ট পিটার্সবার্গ হলো রাশিয়ার সবচেয়ে পশ্চিমাভাবাপন্ন শহর। বাস্তবধর্মী জীবনধারণের এই শহরটাতে মস্কোর চেয়েও বেশি ইউরোপিয়ান ছায়া রয়েছে। অসংখ্য জলধারা বয়ে যাওয়া এই শহরটার ধারে ধারে...

রাশিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

সেন্ট পিটার্সবার্গ হলো রাশিয়ার সবচেয়ে পশ্চিমাভাবাপন্ন শহর। বাস্তবধর্মী জীবনধারণের এই শহরটাতে মস্কোর চেয়েও বেশি ইউরোপিয়ান ছায়া রয়েছে। অসংখ্য জলধারা বয়ে যাওয়া এই শহরটার ধারে ধারে...