দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট বৃত্তান্ত

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পুটিজুরী পাহাড়ের কোলে প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা পাঁচ তারকা রিসোর্ট ‘দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট’। সবুজে ঘেরা পাহাড়ি বন, লেক, ঝর্ণা, আর ৩০ হাজার গাছে ১৫০ একর ভূমিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী এমনভাবে সাজনো হয়েছে যে প্রথম দেখায় একদম ছবির মতো মনে হয়।

এ যেন স্বপ্নের ভেতর কোনো রূপকথার গল্পে ঢুকে যাওয়া। আর চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চা বাগান,আনারস বাগান, রাবার বাগান, আর লেবু বাগান দেখে আপনার সিলেট ভ্রমণের স্বাধ মিটে যেতে পারে। এছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু বিদেশী পাইন গাছ, আর সারি সারি দেবদারু।

হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার জন্য হেলিপ্যাড। সোর্স- TripAdvisor

মূলত এই রিসোর্টটি ঘরে বসেই চা বাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সর্বোচ্চ সুবিধা রেখে বানানো। প্রকৃতিকে বিরক্ত না করতে যাবতীয় ইলেকট্রিক ক্যাবল টানা হয়েছে মাটির নিচ দিয়ে। এর আশেপাশে অবস্থিত কোনো টিলাকে কাটছাঁট করা হয়নি। টিলাগুলোতে রয়েছে ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা।

আর থাকার জন্য টাওয়ার ভবনে ৫৫টি এক্সিকিউটিভ কিং, ২২টি সিগনেচার কিং এবং ৩০টি সিগনেচার টুইন রুম ছাড়াও পাহাড়ের চূড়ায় আছে এক বেডরুমের ৮টি বাংলো, ৪টি হানিমুন ভিলা, দুই বেডরুমের বাংলো ৮টি, তিন বেডরুমের ৪টি ও ২টি প্রেসিডেন্সিয়াল ভিলা। প্রেসিডেন্সিয়াল ভিলার নামকরণে রয়েছে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। আমেরিকায় মুক্তিযুদ্ধের তহবিল গঠনে কাজ করা পন্ডিত রবি শংকর ও জর্জ হ্যারিসনের নামে নামকরণ করা হয়েছে এই ভিলা দুটির।

খাওয়া-দাওয়ার জন্য আছে সায়গন (ভিয়েতনামের কুইজিন), অলিভ (মিক্সড ইন্ডিয়ান, কন্টিনেন্টাল ও ওরিয়েন্টাল কুইজিন), রিভলেশন, অ্যারাবিয়ান লাউঞ্জ ও নস্টালজিয়া (স্ট্রিট ফুড থিম) নামের বাহারি রেস্টুরেন্টগুলো।

চারটি বড় সভাকক্ষ, চারশো জনের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাংকুয়েট হল, ছোটদের খেলার জায়গা, বিলিয়ার্ড, ফুটবল, বাস্কেটবল, ২টি টেনিস কোর্ট, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, ক্রিকেট নেট প্র্যাকটিসের সুবিধা পাওয়া যাবে। ২টি জিম, রিমোট কন্ট্রোল কার রেসিংয়ের ব্যবস্থার মতো সুবিধা এতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

ফিশিংয়ের জন্য লেক। সোর্স- tripadvisor.co

একটু ভিন্ন স্বাদের আরাম-আয়েশের জন্য রয়েছে দুটো সুইমিংপুল (১টি পুরুষ আর একটি মহিলা)। পুলের একদিক থেকে ঝর্ণা আকারে পানি পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে বলে এটাকে বলা হয় ইনফিনিটি পুল। এর চতুর্দিকে সবুজ ছন গাছগুলোও সিলেটীয় ঐতিহ্যের সাক্ষী। দুটো সিনেপ্লেক্সের মধ্যে ১টি থ্রিডি ও অন্যটি টুডি। স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন দুটি ঝুলন্ত সেতু। একমাত্র মসজিদটিতেও রয়েছে চমৎকার সব কারুকাজ। দুটো নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকায় নেই কোনো লোডশেডিংয়ের মতো ভোগান্তি।

এখানে বাইরে থেকে হেলিকপ্টার নামার জন্য তিনটে হেলিপ্যাড আছে। এগুলোও আকর্ষণীয় করে নির্মাণ করা হয়েছে। চাইলে অতিথিরা রিসোর্টের দুটি হ্রদে মাছ ধরতে পারেন। এখানে মাছ ধরার জন্য রয়েছে বড়শি ও তার আনুষাঙ্গিক ব্যবস্থা। একসাথে ৫০ জন এই লেকে ছিপ ফেলতে পারবেন। তবে মাছ শিকারের পর তা রান্না করতে অতিথিদের যেতে হবে এদের নিজস্ব রেস্টুরেন্টগুলোতে। এর জন্য দিতে হবে অতিরিক্ত চার্জ।

ঝুলন্ত ব্রিজ। সোর্স- TripAdvisor

কর্তৃপক্ষের দাবি, অচিরেই রিসোর্টের লেকে বোটিং করা যাবে। হাঁটার জন্য তাদের রয়েছে ৭ কিলোমিটার ট্রেইল। ওয়াইফাই সুবিধা রয়েছে পুরো এলাকাজুড়ে। প্যালেসের ভেতর সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সব ধরনের মৌসুমী ফলের গাছ। অতিথিদেরকে এই ফল দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। আর সব ধরনের সবজি চাষ করা হয় কমপ্লেক্সের ভিতরে নির্দিষ্ট খোলা জায়গায়। যার ফলে এখানে নেই কোনো ভেজাল খাবারের সম্ভাবনা। রয়েছে ২টি ট্যারেস। একটি হলো ‘ফাউন্টেইন ভিউ ট্যারেস’ আর অপরটি হলো ‘টি-গার্ডেন ভিউ ট্যারেস’।

দি প্যালেস রিসোর্টে দিনের বেলায় বসে শোনা যায় পাখির ডাক, আর রাতের বেলা ঝিঁ ঝিঁ পোকার কোরাস। এর মাঝে প্রাকৃতিক পরিবেশে দূর থেকে ভেসে আসে শেয়ালের হাঁক। আর এখানে রাতদিন হরহামেশাই চোখে পড়বে বুনো খরগোসের দৌঁড়ঝাপ। এর বাইরেও আছে কিছু বাড়তি সুযোগ সুবিধার সমাবেশ, যা বাংলাদেশের আর কোনো রিসোর্টে খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্যালেস কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করছে, নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এটি সমগ্র এশিয়া মহাদেশের মধ্যেই অনন্য।

রাতের প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট। সোর্স- TripAdvisor

অবস্থান

‘দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট’ সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার পুটিজুরিতে অবস্থিত।

যেভাবে যাবেন
১। সিলেট থেকে অনেকভাবে যেতে পারেন। যেমন : নিজস্ব গাড়ি দিয়ে, ভাড়া করা গাড়ি দিয়ে (আসা যাওয়ার জন্য খরচ হতে পারে ৫,০০০-৬,০০০ টাকার মতো। এর কম বেশিও হতে পারে)।
২। ঢাকা থেকে যেতে পারেন সিলেটগামী যেকোনো বাসে করে। নামতে হবে হবিগঞ্জের পুটিজুরিতে, এরপর সি.এন. জি যোগে ‘দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট’এ যাবেন ।
৩। এছাড়াও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে ফোন করলে ওরা ওদের নিজস্ব গাড়িতে করে সিলেট বা হবিগঞ্জের যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে নিয়ে যাবে, তবে এতে গুনতে হবে ২,৫০০-৪,০০০ টাকা।

লাক্সারি লিভিং রুম। সোর্স- Tripadvisor

রুম ভাড়া
‘দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট’এ যেতে হলে অবশ্যই আপনাকে রুম বুকিং দিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে ওদের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নেয়া যেতে পারে রুম ট্যারিফগুলো।

১। এক্সিকিউটিভ কিং : সপ্তাহের যেকোনো দিন এক রাতের জন্য গুনতে হবে ১০,০০০ টাকা। আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এটা বেড়ে ১১,০০০ এ দাঁড়ায়। সাথে ১৫% ভ্যাট, ১০% সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে।

২। সিগনেচার কিং : যেকোনো দিন ১১,০০০ টাকা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ১২,৫০০ টাকা।  সাথে ১৫% ভ্যাট, ১০% সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে।

৩। সিগনেচার টুইন : এর ভাড়া সিগনেচার কিংয়ের সমান। যেকোনো দিন ১১,০০০ টাকা । সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ১২,৫০০ টাকা। সাথে ১৫% ভ্যাট, ১০% সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে।

সামনের লন। সোর্স- Vromon

৪। ওয়ান বেডরুমের ভিলা : সপ্তাহের যেকোনো দিন ১৫,০০০ টাকা। আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এটি ১৮,০০০ টাকা। সাথে ১৫% ভ্যাট, ১০% সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে।

৫। হানিমুন ভিলা : সদ্য বিবাহিত দম্পতিদের জন্য এখানে রাখা হয়েছে কিং সাইজের একটি বেড। এক রাতের জন্য সপ্তাহের যেকোনো দিন এর ভাড়া পড়বে ১৫,০০০ টাকা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এটার দাম উঠে আসে ১৮,০০০ এ। সাথে ১৫% ভ্যাট, ১০% সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে।

৬। টু বেডরুম ভিলা : বাচ্চা-কাচ্চা সহ যারা ঘুরতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য ১টি কিং সাইজ ও ১টি টুইন বেড সম্মৃদ্ধ এই ভিলা। যেকোনো দিন একরাতের জন্য ভাড়া ২৫,০০০ টাকা । সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ৩০,০০০ টাকা।  সাথে ১৫% ভ্যাট, ১০% সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে।

হানিমুন ভিলা। সোর্স- TripAdvisor

৭। থ্রি বেডরুম ভিলা : একটু বড় পরিবারের জন্য ২টি কিং+ ১টি টুইন বেডের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে এই ভিলাটি। সপ্তাহের যেকোনো দিন এক রাতের জন্য গুনতে হবে ৩৫,০০০ টাকা। আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এটা বেড়ে ৪০,০০০ এ দাঁড়ায়। সাথে ১৫% ভ্যাট, ১০% সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে।

৮। প্রেসিডেন্সিয়াল ভিলা : ৩ টি কিং সাইজ বেড সম্পন্ন অত্যাধুনিক এই ভিলাটি ব্যবহারের জন্য অতিথিদের প্রতিরাতে গুনতে হবে ১,২০,০০০ টাকা। সাথে ১৫% ভ্যাট, ১০% সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে।

এছাড়াও ডাবল অকাপেন্সির রুমগুলোতে চাইলে অতিরিক্ত অতিথি থাকতে পারেন। সেক্ষেত্রে প্রতি জনের জন্য অতিরিক্ত ৩,০০০ টাকা (সাথে ১৫% ভ্যাট, ১০% সার্ভিস চার্জ) করে প্রদান করতে হবে। রিসোর্টের যাবতীয় বিল ক্রেডিট কার্ডে পে করা যাবে।

ফ্রন্ট সাইড। সোর্স- YouTube

খাবার

ব্রেকফাস্ট : কমপ্লিমেন্টারি। (প্রত্যেক রুমের জন্য ২টি করে)
লাঞ্চ ব্যুফে : ১,২৫০ টাকা।
ডিনার ব্যুফে : ১,৫০০ টাকা।

(১৫ % ভ্যাট এবং ১০ % সার্ভিজ চার্জ প্রযোজ্য)

ব্যুফে ছাড়া রিসোর্টের অনান্য খাবার পরখ করে দেখতে চাইলে অতিথিদের গুনতে হবে সমপরিমাণ অতিরিক্ত টাকা।

অন্যান্য সুবিধা
১। কিডস জোন।

২। হেলিকপ্টারে করে ভ্রমণের সুবিধা।

৩। বার।

৪। সাইকেল রাইডিং।

৫। রেস্টুরেন্টের রুম সার্ভিস সুবিধা।

তবে রুম ট্যারিফের বাইরেও এসবের জন্য অতিথিদেরকে গুনতে হবে বেশ মোটা অংকের টাকা। যেমন মাত্র ৭ মিনিটের একটি হেলিকপ্টার রাইডিংয়ের দাম ৫০,০০০ টাকা। আবার ২০০ টাকা খরচায় ইচ্ছে মতো সাইকেল চালানো যায়।

var loaded = false; var loadFB = function() { if (loaded) return; loaded = true; (function (d, s, id) { var js, fjs = d.getElementsByTagName(s)[0]; if (d.getElementById(id)) return; js = d.createElement(s); js.id = id; js.src = "http://connect.facebook.net/en_US/sdk.js#xfbml=1&version=v3.0"; fjs.parentNode.insertBefore(js, fjs); }(document, 'script', 'facebook-jssdk')); }; setTimeout(loadFB, 0); document.body.addEventListener('bimberLoadFbSdk', loadFB); })();

Must Read

বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের খানিক ইতিহাস ও দর্শনীয় স্থানগুলো

বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত গৌড় নগর ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় অন্যতম বৃহৎ নগরী। এটি বাংলার প্রাচীন রাজধানী। আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত...

সুন্দরবনের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ

বাংলাদেশের মধ্যে যে কয়েকটি স্থান ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। এখানে সুন্দরী গাছের আবাসস্থল রয়েছে এবং এটি...

দ্বিতীয় দিন-দুপুরের আগে পৌঁছাতে হবে কালাপোখরি

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ওয়াশরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে, বসে আছি কিছুক্ষণ। তখনো ভোর হয়নি, হঠাৎ বামে তাকালাম। আমি যা দেখলাম পরের ৫ মিনিট আমি...