প্রাচীন নিদর্শন ও ঐতিহাসিক বহু মন্দিরের দেখা পেতে পুঠিয়া ভ্রমণ

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত রাজশাহী জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা ‘পুঠিয়া’। প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন জনপদের অংশ পুঠিয়ার জনবসতি হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করছে। রাজশাহী শহর থেকে পুঠিয়ার দুরত্ব ৩২ কিলোমিটার। প্রাচীন জমিদার বাড়ির জন্য পুঠিয়া বিখ্যাত।
এ উপজেলাটিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ঐতিহাসিক মন্দির রয়েছে। পুঠিয়ায় অবস্থিত অধিকাংশ মন্দিরে পোড়ামাটির ফলক স্থাপিত। এখানকার পুরাকীর্তির মধ্যে পাঁচআনি রাজবাড়ি বা পুঠিয়া রাজবাড়ি, চারআনি রাজবাড়ি ও ১৩টি মন্দির রয়েছে। পুঠিয়ার প্রত্ননিদর্শনের মধ্যে ১৪টি স্থাপনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করেছে।
চলুন জেনে নেয়া যাক পুঠিয়ার কয়েকটি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে।

পুঠিয়া রাজবাড়ি:

পুঠিয়া রাজবাড়ি; source: c1.staticflickr.com

বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের মধ্যে রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ি অন্যতম। এটি পুঠিয়া রাজবাড়ির পাশাপাশি পাঁচআনি জমিদার বাড়ি নামেও পরিচিত। পুঠিয়া রাজবাড়ির আশেপাশে ছয়টি রাজ দিঘী রয়েছে। প্রত্যেকটি দিঘীর আয়তন ছয় একর করে। ভেতরে মন্দিরও রয়েছে ছয়টি। সবচেয়ে বড় মন্দিরটি হচ্ছে শিব মন্দির।
এছাড়াও রয়েছে রাধাগোবিন্দ মন্দির, গোপাল মন্দির, গোবিন্দ মন্দির, দোলমঞ্চ ইত্যাদি। প্রতিটি মন্দিরের দেয়ালেই অপূর্ব সব পোড়ামাটির ফলকের কারুকাজ দেখা যায়। জোড় বাংলা মন্দির, বাংলো মন্দির, পঞ্চরত্ন বাংলার বিভিন্ন গড়নরীতির মন্দিরগুলোর প্রতিটিই আকর্ষণীয়। এ ছাড়া রানির স্নানের ঘাট, অন্দর মহল মিলিয়ে বিশাল এই রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ।

গোবিন্দ মন্দির:

গোবিন্দ মসজিদ; source: https://onuvromon.com

পুঠিয়া পাঁচআনি জমিদার বাড়ি অঙ্গনে অবস্থিত গোবিন্দ মন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি। একটি উঁচু বেদীর উপর প্রতিষ্ঠিত বর্গাকার নির্মিত মন্দিরের কেন্দ্র স্থলে রয়েছে একটি কক্ষ ও চার কোণায় রয়েছে চারটি বর্গাকৃতির ছোট কক্ষ। গর্ভগৃহের চারপাশে রয়েছে চারটি খিলান প্রবেশ পথ।
এ মন্দিরের কার্ণিশ কিছুটা বাঁকানো। আর মন্দিরের পিলার ও দেয়াল অসংখ্য দেব-দেবী, যুদ্ধের সাজসজ্জা, ফুল ইত্যাদির পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সাজানো। জানা যায়, প্রেম নারায়ণ রায় আঠারো খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

বড় শিব মন্দির:

বড় শিব মন্দির; source: http://poriborton.com

পুঠিয়া বাজারে প্রবেশ করতেই হাতের বাম পাশে শিব সাগর নামক দীঘির দক্ষিণ পাড়ে বড় শিব মন্দির অবস্থিত। ১৮২৩ সালে নারী ভূবনময়ী দেবী এ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। উঁচু মঞ্চের উপর নির্মিত মন্দিরটির দক্ষিণ দিকে সুপ্রশস্ত সিঁড়ি সহ প্রধান প্রবেশ পথ রয়েছে।
মন্দিরের রয়েছে চারপাশে টানা বারান্দা এবং বারান্দায় রয়েছে পাঁচটি করে খিলান প্রবেশ পথ। মন্দিরের উত্তর পাশে অবস্থিত দীঘিতে নামার জন্য বাঁধানো ঘাট রয়েছে। ঘাটের চারকোণে চারটি ও কেন্দ্রস্থলে একটি চূড়া রয়েছে।

ছোট শিব মন্দির:

ছোট শিব মন্দির; source: https://eibela.com

বর্গাকারে নির্মিত ছোট আকৃতির এ মন্দিরটি রাজবাড়ি থেকে ১০০ মিটার দক্ষিণে, পুঠিয়া আড়ানী সড়কের পূর্ব পাশে অবস্থিত। মন্দিরের দক্ষিণ দেয়ালে একটি মাত্র খিলান প্রবেশ পথ রয়েছে। মন্দিরের কার্ণিশগুলো আংশিক বাঁকানো এবং পোড়ামাটির অলংকরণ দ্বারা দারুণভাবে সাজানো। মন্দিরটি তার নির্মাণশৈলী, কারুকাজ ও পোড়ামাটির অলংকরণ সব মিলিয়ে দেখতে দারুণ।

বড় আহ্নিক মন্দির:

বড় আহ্নিক মন্দির; source: dw.com

লম্বা আয়তাকার এই মন্দিরটিতে পাশাপাশি তিনটি কক্ষ রয়েছে। মাঝের কক্ষের পূর্ব দিকে তিনটি খিলান প্রবেশ পথ এবং উপরে দোচালা আকৃতির ছাদ রয়েছে। আয়তাকার কক্ষের দক্ষিণ ও উত্তর পাশের কক্ষ দুটি বর্গাকৃতির এবং পূর্বদিকে ১টি করে সরু খিলান প্রবেশ পথ রয়েছে।
মন্দিরটির ছাদ চৌচালা আকৃতির। মন্দিরটির সামনের দেয়ালে অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক রয়েছে। পুঠিয়া চারআনি জমিদার কর্তৃক মন্দিরটি সতের-আঠার শতকের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত বলে জানা যায়।

ছোট আহ্নিক মন্দির:

ছোট আহ্নিক মন্দির; source: http://poriborton.com

পুঠিয়া রাজবাড়ির দক্ষিণ পাশে এ মন্দিরটি অবস্থিত। আয়তাকার নির্মিত উত্তর দক্ষিণে লম্বা এ মন্দিরের পূর্বদিকে পাশাপাশি ৩টি এবং দক্ষিণ দেয়ালে ১টি খিলান দরজা রয়েছে। মন্দিরের ছাদ দোচালা আকৃতির এবং আংশিক বাঁকানো। মন্দিরটি আঠার খ্রিস্টাব্দে প্রেম নারায়ণ কর্তৃক নির্মিত বলে জানা যায়।

কেষ্ট খেপার মঠ:

বাংলাদেশের প্রাচীন এক মঠ; source: https://www.banglainsider.com/

বড় শিব মন্দির থেকে আনুমানিক ৫০০ মিটার পশ্চিমে রাম জীবনপুর গ্রামে অবস্থিত এ মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে কেষ্ট খেপার মঠ নামে পরিচিত। বর্গাকারে নির্মিত এর দক্ষিণ দেয়ালে একটি মাত্র প্রবেশ পথ রয়েছে এবং উপরে ২৫টি মৌচাকৃতির ছাদ দ্বারা আবৃত। মন্দিরটি অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে নির্মিত বলে ধারণা করা যায়।

হাওয়া খানা:

হাওয়া খানা; source: http://banglakagoj.news

পুঠিয়া রাজশাহী মহাসড়কের তারাপুর বাজার থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দক্ষিণে এবং পুঠিয়া বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে একটি পুকুরের মধ্যবর্তী স্থানে হাওয়াখানা অবস্থিত। এ ইমারতের দক্ষিণ পাশে দোতালায় ওঠার জন্য সিঁড়ি রয়েছে। জানা যায়, পুঠিয়া রাজবাড়ির সদস্যরা রাজবাড়ি থেকে রথ বা হাতি যোগে এ স্থানটিতে আসতেন পুকুরে নৌকায় চড়ে অবকাশ যাপন করতে। এবং তারা হাওয়া খানায় বসে এখানকার পুকুরের খোলা হাওয়া উপভোগ করতেন।

কৃষ্ণপুর মন্দির (সালামের মঠ):

বাংলার প্রাচীনত্ব; source: https://flickr.com

পুঠিয়া বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে কৃষ্ণপুর গ্রামে খোলা মাঠে এ মন্দিরটি অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে এটি সালামের মঠ নামে পরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি গোবিন্দ মন্দির। প্রবেশপথের উপরে ও দুপাশে পোড়ামাটির ফলকদ্বারা চমৎকারভাবে সজ্জিত এই মন্দিরটি।

জগন্নাথ মন্দির বা রথ মন্দির:


বড় শিব মন্দির সংলগ্ন পূর্বদিকে শিবসাগর নামক দীঘির দক্ষিণ পাশে জগন্নাথ মন্দির বা রথ মন্দির অবস্থিত। এ মন্দিরটির দোতলার কক্ষটি ছোট এবং এর চারপাশে উন্মুক্ত প্রবেশদ্বার রয়েছে। মন্দিরটি ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে রানী ভূবনময়ী কর্তৃক নির্মিত বলে জানা যায়।
ফিচার ইমেজ- https://jakir.me/

Must Read

বান্দরবান পর্ব

বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ ধরে রেখেছে এদেশের সবচেয়ে সুন্দর অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে রয়েছে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি সহ আরো অনেক জেলা।...

স্বপ্নপুরির জগতে একটি দিন

সাধারণ পার্কের সঙ্গে থিম পার্কের পার্থক্য হচ্ছে, এটি একটি থিম বা বিষয়বস্তুর ওপর তৈরি করা হয়। সেই থিমকে কেন্দ্র করে এর স্থাপনা এবং রাইডগুলো...

যে গিরিতটের নীলিমায় হারিয়ে যাওয়া যায় অনায়াসেই

বান্দরবান যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছিল দু’মাস আগ থেকে। কিন্তু দিন তারিখ ঠিক হচ্ছিল না কিছুতেই। দু’দিন পর পর নীল আর ইমুর কাছে ভাঙা ক্যাসেট প্লেয়ার...