বান্দরবান পর্ব

বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ ধরে রেখেছে এদেশের সবচেয়ে সুন্দর অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে রয়েছে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি সহ আরো অনেক জেলা। বাংলাদেশ সহ এদেশে ঘুরতে আসা অধিকাংশ বৈদেশিক পর্যটকদের প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে এখানকার পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্দান্ত সব ভ্রমণ স্থান চষে বেড়ানো।

বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে থেকে বা এসে কেউ যদি পাহাড়ে না যায় তবে বাংলাদেশের সৌন্দর্যের পনেরো আনাই তার অদেখা রয়ে যাবে। আর আমি বলি আপনি যদি ভ্রমণপ্রেমী হয়ে থাকেন এবং এখনো বান্দরবান, খাগড়াছড়ি বা রাঙ্গামাটি না গিয়ে থাকেন তবে আজই ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্দেশ্য।

এক একটা জেলা এতই সৌন্দর্যে ভরপুর যে শুধু বান্দরবান পুরোটা ঘুরতে যে কারো এক মাসের মতো সময় লেগে যাবে। আজকে গল্প করবো বান্দরবানের বাজেট ট্যুর নিয়ে। এই সিরিজের লেখাগুলোতে তুলে ধরবো কীভাবে খুব কম খরচে সবচেয়ে বেশি জায়গা ঘুরে আসা যায়। চলুন তাহলে শুরু করা যাক বান্দরবানে কম খরচে ঘুরে আসার গল্প।

নয়নাভিরাম বান্দরবন, ছবিঃ লেখক

পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে সবচেয়ে বড় জেলা বান্দরবান। পুরো বান্দরবানের আনাচে কানাচে শুধুই বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের লীলাখেলা চলে। কোথাও আছে সুবিশাল হ্রদ, সুউচ্চ পাহাড় আবার কোথাও পাহাড়ের গা বেয়ে আছড়ে পড়ে প্রকাণ্ড সব জলপ্রপাত। এখানে যে একবার এসেছে সে বান্দরবানের প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছে।

জল-জঙ্গলে ঘেরা হাজারো মেঘের ছায়ায় এক অনন্য সুন্দর গল্প বলে বান্দরবান। বান্দরবানে ঘুরে বেড়ানোর জায়গা প্রচুর। তবে ট্রেকারদের জন্য বান্দরবানকে স্বর্গদ্বার বলা যেতে পারে। এখানে প্রতিটি ট্রেকে যেতে হলে হাতে সময় রাখতে হবে অন্ততপক্ষে ৩ দিন। বান্দরবানের মূল ট্রেকিং রুটগুলো হলো:

১. বগালেক-কেওক্রাডং-জাদিপাই ট্রেক
২. নাফাখুম-আমিয়াখুম-সাতভাইখুম ট্রেক
৩. সাকাহাফং ট্রেক
৪. তিনাপ সাইতার ট্রেক
৫. আলিকদম-দামতুয়া তুক অ/ ব্যাঙ ঝিরি ট্রেক
৬. তাজিংডং ট্রেক

বগালেক, ছবিঃ লেখক

ট্রেক বিহীন ঘুরতে যাওয়ার জায়গা হলো:

১. নীলগিরি
২. নীলাচল
৩. মেঘলা
৪. চিম্বুক পাহাড়

কেওক্রাডং এর পথে চিংড়ি ঝর্ণায়, ছবিঃ লেখক

এছাড়াও ছোট বড় আরো ট্রেক এবং ঘুরতে যাওয়ার জায়গা আছে। আপনার হাতে যদি যথেষ্ট সময় আর শক্তি থাকে তবে পুরো বান্দরবান একবারেই ঘুরে ফেলা সম্ভব। তবে বান্দরবান ঘুরতে যাওয়ার আগে সবচেয়ে দরকারী যে বিষয় সেটা হলো অন্তত পক্ষে ১০ থেকে ১২ জনের একটি গ্রুপ তৈরী করা। বান্দরবানের অধিকাংশ জায়গায় যেতে চান্দের গাড়ি লাগে যেখানে সর্বোচ্চ ১২ জন বসতে পারে। তাই ১২ জনের গ্রুপ গেলে খরচ কমে যাবে অনায়াসেই। সাথে কমে যাবে গাইডের খরচ। অনেক জায়গায় যেতে নৌকা লাগে, সেক্ষেত্রে কমে যাবে নৌকা ভাড়াও।

উপরে যে ছয়টি ট্রেকের নাম লিখেছি তার মধ্যে দুইবারে প্রথম দুটি ট্রেকে যাবার সুযোগ হয়েছে। সময়ের অভাবে বাকিগুলো এখনো করা হয়ে ওঠেনি। কেওক্রাডং আর আমিয়াখুম ট্রেক করে আসতে মোটামুটি ৫-৬ দিন সময় লেগে যাবে। নিচে এই দুই ট্রেকে যাওয়ার উপায় আর যাবতীয় খরচাদি দিয়ে দিলাম।

বগালেক পাড়া, ছবিঃ লেখক

কেওক্রাডং ট্রেক:

কেওক্রাডং ট্রেকে যেতে হলে প্রথমেই ঢাকা থেকে বান্দরবানের বাসে চেপে বসুন। সায়েদাবাদ থেকে ইউনিক সহ প্রচুর বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ইউনিকের সার্ভিস ভালো, ভাড়া ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। রাতের বাসে উঠলে সকালে নামিয়ে দেবে বান্দরবান বাস স্ট্যান্ডে।

বাস স্ট্যান্ডের খুব কাছেই দুটো ব্রীজ পড়বে। ব্রীজ পেরিয়ে হাতের ডান পাশের গলি দিয়ে ঢুকে পড়ুন। হোটেল প্যারাডাইস পাবেন। যদি ভারী ব্যাগপত্র থাকে তবে শুধু সেগুলো রাখার জন্য একটি সাধারণ রুম নিন যেটা ৬০০ টাকার মধ্যেই পেয়ে যাবেন। যদি কাঁধ-ব্যাগের ওজন বেশি না হয় তবে রুম নেওয়ার দরকার নেই। সকালের নাস্তা সেরে ব্রীজের কাছে চলে যান, অনেক চান্দের গাড়ি পেয়ে যাবেন। ৩,৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে রুমা বাজার যাওয়ার জন্য চান্দের গাড়ি পেয়ে যাবেন।

রুমায় পৌছে গাইড নিয়ে নেবেন। গাইডের খরচ ৬০০ টাকা করে প্রতিদিন। কমবেশি হতে পারে কারণ দুই বছর আগের কথা বলছি। রুমা থেকে গাইড লাগবে দুইদিন কেওক্রাডং যেতে হলে। যদি আপনি শীতকালে বান্দরবান যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন তবে রুমা বাজার থেকে সরাসরি বগালেক পর্যন্ত ল্যান্ডরোভার গাড়ি করে যেতে পারবেন। আর যদি সময়টা হয় গ্রীষ্ম বা বর্ষাকাল তবে গাড়ি আপনাকে ৬-৭ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে দেবে, ভাড়া নেবে প্রতি গাড়ি ৩,০০০ টাকা।

রিঝুক ঝর্ণা, ছবিঃ লেখক

প্রতি গাড়িতে ড্রাইভারসহ ৬ জন বসতে পারে। গাড়ি যেখানে নামিয়ে দেবে সেখান থেকে শুরু হবে ট্রেকিং। মোটামুটি ৩-৩.৫ ঘণ্টার ট্রেকিং করলে কমলাপাড়া পেরিয়ে বগালেক পৌঁছে যাবেন। বগালেকে সে রাতটা থাকতে হবে। বগালেকের পাশে কটেজ নিয়ে নিন, প্রতি সীটের ভাড়া প্রতি রাতের জন্য ১০০ টাকা।

কটেজ মালিকের কাছে খাওয়া-দাওয়া করতে পারেন, ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে খাবার খরচ সীমাবদ্ধ। পরদিন আবার ট্রেক শুরু করতে হবে। আরো তিন-চার ঘণ্টা ট্রেক করে চিংড়ি ঝর্ণা, দার্জিলিং পাড়া পেরিয়ে পৌঁছে যাবেন কেওক্রাডংয়ে। কেওক্রাডংয়ে রাতে থাকতে পারবেন, কটেজ আর খাবার খরচ একই রকম। কেওক্রাডং থেকে ফেরার সময় হাঁটতে হাঁটতে একবারে বগালেক হয়ে যেখানে গাড়ি নামিয়ে গিয়েছিল সেখানে এসে থামুন। একই উপায়ে ফিরে যান রুমায়, রুমা থেকে বান্দরবান সদরে।

যদি রুমা থেকে বান্দরবান চান্দের গাড়ি দিয়ে না যেতে চান তবে নৌকা ঠিক করুন বান্দরবান বাজার থেকে। নৌকাটি রিঝুক ঝর্ণা দেখিয়ে ইউটার্ন নিয়ে আপনাকে পৌঁছে দেবে বান্দরবান সদরে। নৌকা ভাড়া ৫,০০০-৫,৫০০ টাকা। ১২ জনের জন্য একদম যুতসই নৌকা যেটা বান্দরবান পৌঁছে যাবে তিন থেকে চার ঘণ্টার ব্যবধানে।

নাফাখুম যাওয়ার পথে, ছবিঃ লেখক

আমিয়াখুম-নাফাখুম ট্রেক:

আমিয়াখুম-নাফাখুম বান্দরবানের অন্যতম জনপ্রিয় এবং সহজ ট্রেকিং রুট। কেওক্রাডং যেতে হলে যেমন রুমা বাজারে যেতে হয় তেমনি আমিয়াখুম যেতে হলে প্রথমে থানচি বাজারে যেতে হবে। এজন্য বান্দরবান সদরে পৌঁছেই চলে যাবেন বান্দরবানস্থ “থানচি বাসস্ট্যান্ড”য়ে।

সেখান থেকে সকাল ১০টার পর বাস ছাড়ে। আগেও ছাড়তে পারে, সঠিক জানা নেই। থানচি পর্যন্ত টিকেট ভাড়া ২০০ টাকা। যদি এমন হয় যে প্রথমবারের মতো থানচি যাচ্ছেন তবে বাসের ছাদে উঠে পড়ুন। একই ভাড়ায় দ্বিগুণ সৌন্দর্য দেখতে পাবেন। বান্দরবান থেকে থানচি যেতে সময় লাগবে পাক্কা ৪ ঘণ্টা। থানচি পৌঁছে ১০০ টাকা দিয়ে পর্যটন অফিস থেকে একটা ফর্ম নিয়ে গ্রুপের সবার নাম, আইডি নাম্বার, মোবাইল নং এন্ট্রি করিয়ে থানচি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে জমা দিয়ে আসুন।

যদি কোনোমতে থানচি পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল চারটার বেশি বেজে যায় তবে সেদিনকার মতো থানচিতেই রাত কাটাতে হবে। থানচির হোটেল ভাড়া ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। খাওয়া-দাওয়া করা যাবে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। যদি বিকেলের আগে থানচি পৌঁছে যান তবে পুলিশ স্টেশন থেকে অনুমতি নিয়ে নৌকা আর গাইড ঠিক করে ফেলুন। প্রতি নৌকায় ৪ জন বসতে পারে, যাওয়া আসার ভাড়া ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা। থানচি থেকে যে গাইড ঠিক করবেন তাকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে দিতে হবে।

থানচি থেকে নৌকায় করে আপনি যাবেন রেমাক্রিতে। রেমাক্রি থেকে গাইড পরিবর্তন হবে। তাকেও প্রতিদিনের জন্য দিতে হবে ৫০০ টাকা। রেমাক্রি থেকে নাফাখুম সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার হাঁটা পথ, আমিয়াখুম যেতে হলে মাঝপথে একটি পাড়ায় থাকতে হবে। গাইডই সব বলে দেবে। আমিয়াখুম, সাতভাইখুম যাওয়ার পথে দেবতা পাহাড় পড়বে। বলা হয়ে থাকে এই দেবতা পাহাড় যারা পার করে ফেলেছে তাদের জন্য বাংলাদেশের কোনো ট্রেকিং রুটই আর কঠিন নয়। মাঝপথে কটেজে থাকতে জনপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা খরচ হবে, খাবার দাবারও পাওয়া যাবে ১৫০ টাকার মধ্যে।

নাফাখুম জলপ্রপাত, ছবিঃ লেখক

কেওক্রাডং ট্রেক করে আসতে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৪,০০০ টাকা আর আমিয়াখুম, নাফাখুম ট্রেক করে আসতে সর্বোচ্চ ৩,৫০০ টাকার মতো খরচ হবে। খরচ বাড়বে বান্দরবান শহরে এসে। ট্রেকিং শেষ করে যদি নীলাচল, নীলগিরি দেখতে চান তবে আবার চান্দের গাড়ি ভাড়া করতে হবে। ভোরে নীলগিরি আর বিকেলে নীলাচল ঘুরিয়ে আনবে, মাঝপথে শৈলপ্রপাত আর মেঘলাও দেখিয়ে দেবে। এই তিন জায়গা ঘুরতে চান্দের গাড়ি ভাড়া নিবে ৫,০০০ টাকা।

বান্দরবান শহরে খাবার-দাবারের দামও একটু বেশি। তাই দুই জায়গায় ট্রেক করতে আর শহরের আশেপাশের জায়গাগুলো দেখতে হলে কমপক্ষে ৯,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা নিয়ে গেলে আরামসে ঘুরে আসা যাবে। ভ্রমণ হোক সুন্দর, সাশ্রয়ী আর নিরাপদ।

ফিচার ইমেজ- লেখক

var loaded = false; var loadFB = function() { if (loaded) return; loaded = true; (function (d, s, id) { var js, fjs = d.getElementsByTagName(s)[0]; if (d.getElementById(id)) return; js = d.createElement(s); js.id = id; js.src = "http://connect.facebook.net/en_US/sdk.js#xfbml=1&version=v3.0"; fjs.parentNode.insertBefore(js, fjs); }(document, 'script', 'facebook-jssdk')); }; setTimeout(loadFB, 0); document.body.addEventListener('bimberLoadFbSdk', loadFB); })();

Must Read

বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের খানিক ইতিহাস ও দর্শনীয় স্থানগুলো

বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত গৌড় নগর ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় অন্যতম বৃহৎ নগরী। এটি বাংলার প্রাচীন রাজধানী। আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত...

সুন্দরবনের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ

বাংলাদেশের মধ্যে যে কয়েকটি স্থান ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। এখানে সুন্দরী গাছের আবাসস্থল রয়েছে এবং এটি...

দ্বিতীয় দিন-দুপুরের আগে পৌঁছাতে হবে কালাপোখরি

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ওয়াশরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে, বসে আছি কিছুক্ষণ। তখনো ভোর হয়নি, হঠাৎ বামে তাকালাম। আমি যা দেখলাম পরের ৫ মিনিট আমি...