রাশিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

সেন্ট পিটার্সবার্গ হলো রাশিয়ার সবচেয়ে পশ্চিমাভাবাপন্ন শহর। বাস্তবধর্মী জীবনধারণের এই শহরটাতে মস্কোর চেয়েও বেশি ইউরোপিয়ান ছায়া রয়েছে। অসংখ্য জলধারা বয়ে যাওয়া এই শহরটার ধারে ধারে রয়েছে অসংখ্য দালানকোঠা; যেগুলোতে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, মার্কেট, ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট এবং মোহনীয় সব জাদুঘর।
এটা হচ্ছে রাশিয়ার সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর শহর। শান্তশিষ্ট, আরামদায়ক শহরটাতে জড়িয়ে রয়েছে শান্তির সুবাস। রাশিয়ার রাজধানীর ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে সেন্ট পিটার্সবার্গই সবচেয়ে সেরা জায়গা। যারা রাশিয়া ভ্রমণে যেতে চাইছেন অথবা ভ্রমণের গন্তব্য খুঁজছেন, তাদের জন্য সেন্ট পিটার্সবার্গ হতে পারে সম্ভাব্য একটি গন্তব্য। তবে যাওয়ার আগে যেসব ব্যাপারে জেনে রাখা উচিৎ তা জানিয়ে দিচ্ছি।

সেন্ট পিটার্সবার্গে কেন যাওয়া উচিৎ?

প্রায় দুইশো বছর রুশ সাম্রাজ্যের রাজধানী হওয়ায় সেন্ট পিটার্সবার্গের পুরোটা জুড়েই রয়েছে অসংখ্য প্রাসাদ, জমকালো চত্বর এবং বিশাল বিশাল দুর্গ। শহর জুড়ে রুশ সম্রাট জার চিহ্ন ছড়িয়ে থাকলেও এর সাথে সাথে কম্যুনিস্ট যুগের ছাপও মিশে আছে। ১৯১৭ সালের কম্যুনিস্ট বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকেই। এছাড়াও শহরে মিশে আছে পুরনো লেনিনগ্রাদ এবং ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসংখ্য স্মৃতি। সৌভাগ্যবশত সেন্ট পিটার্সবার্গের বড় একটা অংশে সোভিয়েত আমলের কোনো ছোঁয়া পড়েনি এবং শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্রে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে নব্য-ধ্রুপদী আমলের দালানসমূহ।
শহরটার বয়স মাত্র তিনশো বছর হলেও সেন্ট পিটার্সবার্গের সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ইতিহাস এবং এর সংস্কৃতিও বেশ বিস্তৃত। এখানকার মিউজিয়ামগুলোতে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম। জার আমলের প্রাসাদগুলো এখন ধনীদের বাসস্থান এবং এখানকার বিলাসবহুল দালানগুলো একসময় ছিল রাশিয়ার বিখ্যাত লেখকদের আবাসস্থল। শহরটা আকৃতিতে বেশ ছোট এবং গঠনপ্রণালীও সরল হওয়ায় এখানে ঘুরে বেড়ানো বেশ সহজ। পায়ে হেঁটেই শহর মূল আকর্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে দেখা যায়।
সেন্ট পিটার্সবার্গে ভ্রমণের সেরা সময় হলো মধ্য-জুন থেকে মধ্য-জুলাই পর্যন্ত। সাদা রাতের কারণেই এই সময়টা সবচেয়ে সেরা। উত্তরীয় মধ্য-গ্রীষ্মের এই সময়টায় সূর্য সবসময়ই আভা ছড়ায়, তাই এই সময়টায় শহরটা পুরোপুরি অন্ধকারে গ্রাস হয় না। আবহাওয়া থাকে আরামদায়ক উষ্ণ পর্যায়ে।

সেন্ট পিটার্সবার্গের সাদা রাতের দৃশ্য; সোর্স – russian-tradition.com

যে স্থানগুলো মিস করা উচিৎ হবে না

নেভা নদীর তীরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা উইন্টার প্যালেসটি ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার আগ পর্যন্ত জার পরিবারের আবাসস্থল ছিল। বর্তমানে এই বিশাল বারোক দালানটিতেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ মিউজিয়াম হার্মিটেজ। এই মিউজিয়ামের সংগ্রহশালায় রয়েছে শতশত বছরের পুরনো আর্টিফ্যাক্ট থেকে শুরু করে বর্তমান উনবিংশ-বিংশ শতাব্দির ইউরোপিয়ান শিল্পসমূহ। সেন্ট পিটার্সবার্গে গেলে অবশ্যই এখানে যাওয়া উচিৎ। সাথে এটাও জেনে রাখা ভালো যে, বিশাল এই মিউজিয়ামের সবগুলো রুম ও গ্যালারি ঘুরে দেখতে অন্তত একদিনের অর্ধেকটা সময় হাতে রাখতে হবে।

হার্মিটেজ মিউজিয়াম; সোর্স – NaughtyNut

মোহনীয় দৃশ্য দেখতে চাইলে নদী ধরে এগিয়ে যেতে হবে পিটার অ্যান্ড পল দুর্গে। বর্তমানে এটি একটি পর্যটক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে বেশ কিছু মিউজিয়াম, গ্যালারির সঙ্গে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্যাথেড্রাল। তবে দুর্গের প্রধান আকর্ষণ কেন্দ্রটি হলো, এখান থেকে নদী তীরের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়।

পল অ্যান্ড পিটার ফরট্রেসের এরিয়াল ভিউ; সোর্স – picdn.net

শিল্পপ্রেমীদের কোনোভাবেই স্টেট রাশিয়ান মিউজিয়াম এড়িয়ে যাওয়া উচিৎ হবে না। এখানকার সংগ্রহশালায় রয়েছে হাজার বছরের অসংখ্য রাশিয়ান শিল্পের সমাহার। ফ্যাব্রে মিউজিয়ামের জন্যও হাতে কিছু সময় রাখা ভালো। ফ্যাব্রে ডিমের সবচেয়ে বড় সংগ্রহটাই রয়েছে এখানে, এছাড়াও সাথে আছে জার এবং অভিজাত পরিবারের ব্যবহৃত হস্তনির্মিত সামগ্রীও।

রাশিয়ান স্টেট মিউজিয়ামের অভ্যন্তরীণ একটি দৃশ্য; সোর্স – travel-assets.com

ফ্যাব্রে মিউজিয়ামে থাকা ফ্যাব্রে ডিম; সোর্স – ansa.it

শহরের চার্চ ও রাজকীয় বাসভবনসমূহ

সেন্ট পিটার্সবার্গে থাকা চার্চ এবং ক্যাথেড্রালসমূহ অবশ্যই শহরের আকর্ষণ বিন্দুগুলোর একটি। শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত দালানগুলোর একটি হচ্ছে স্যাভিয়র অফ দ্য স্পিল্ড ব্লাডের চার্চ। চার্চের গম্বুজগুলো হরেকরকম বর্ণের এবং নির্মিত হয়েছে মোজাইক দিয়ে। বারোক ও নব্য-ধ্রুপদী ধাঁচের স্থাপত্যশিল্পের সমাহারে এই চার্চটা নিশ্চিতভাবেই শহরের সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শনগুলোর একটি। এর কাছাকাছিই রয়েছে কাযান ক্যাথেড্রাল। বিশাল এই মার্জিত দালানটির ভার বহন করছে পাথরের তৈরি বিশাল একটি স্তম্ভ এবং এর ডিজাইন করা হয়েছে রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার আদলে। এছাড়াও ডিসেম্ব্রিস্ট স্কয়ারে রয়েছে সেন্ট আইজ্যাক ক্যাথেড্রাল। এই ক্যাথেড্রালের গম্বুজগুলো শহরের সবচেয়ে উঁচু চূড়াগুলোর একটি। শহরের বিস্তৃত দৃশ্য দেখতে চাইলে এই ক্যাথেড্রালের গম্বুজের চূড়াই সবচেয়ে সেরা জায়গা।

চার্চ অফ স্যাভিয়র অফ দ্য স্পিল্ড ব্লাড

কাযান ক্যাথেড্রাল; সোর্স – FOTOGRIN

সেন্ট আইজ্যাক ক্যাথেড্রালের গম্বুজ; সোর্স – cloudfornt

সাম্রাজ্যকালীন প্রাসাদ পিটারহফ এবং জারসোক সেলোতে না গেলে সেন্ট পিটার্সবার্গ ভ্রমণ কখনোই পূর্ণ হবে না। দুটো প্রাসাদই দিনের বেলায় ভ্রমণ করা উচিৎ। পিটারহফ প্রাসাদটি রয়েছে শহরের একপ্রান্তে। এর বিস্তৃত ফোয়ারা এবং জলপ্রপাতের জন্য প্রাসাদটি বিখ্যাত। আর জারসোক সেলো প্রাসাদটি বিখ্যাত এর নীল-সাদা রাশিয়ান বারোক ক্যাথেরিন স্থাপত্যশিল্পের জন্য। বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে মোহনীয় এক ভুদৃশ্যের পার্কে।

জারসেক সেলো; সোর্স – visit-petersburg.ru

পিটারহফ ফোয়ারা; সোর্স – spb.ru

রেস্টুরেন্ট ও পানশালাসমূহ

সেন্ট পিটার্সবার্গে রয়েছে অসংখ্য পানশালা, ক্যাফে এবং রেস্টুরেন্ট যেগুলোতে রাশিয়ান ব্লিনি (প্যানকেক) থেকে শুরু করে জাপানিজ সুশিসহ সবকিছুই পাওয়া যায়। রেস্টুরেন্ট গেলে অবশ্যই পিরোগি (আলু বা বাঁধাকপি এবং পনির দিয়ে তৈরি এক প্রকার পাই) এবং বর্স্ট (শালগম এবং গরুর মাংসে তৈরি এক প্রকার সুস্বাদু স্যুপ) চেখে দেখা উচিৎ। ঐতিহ্যবাহী রাশিয়ান খাবার খেতে চাইলে মোহনীয় রেস্টুরেন্ট টেস্ট টু ইটে যাওয়াই ভালো। উষ্ণ পরিবেশ ও মৃদু আলোর এই রেস্টুরেন্টে সব রকমের রাশিয়ান খাবারই পাওয়া যায়।

পিরোগি; সোর্স – comeirrez

বর্স্ট

সেন্ট পিটার্সবার্গের নৈশপ্রকৃতি বেশ সুস্থির ও শান্ত। নিঃসন্দেহেই মস্কোর চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। এখানকার জলধারার পাশ ঘেঁষে অসংখ্য পানশালা। বারগুলোতে গেলেই দেখা যাবে অসংখ্য যুবক বয়সী মানুষজন রয়েছে। ভালো ককটেলের জন্য পোল্টরি কমনেটিই সবচেয়ে ভালো জায়গা। এছাড়া লাইভ মিউজিকের প্রতি আগ্রহ থাকলে দ্য হ্যাট ব্যারোফার্স সেরা।

থাকার জায়গাসমূহ

গত কয়েক বছর ধরে রুবলের মুল্যহ্রাসের কারণে এই শহরের থাকার খরচ মেটাতে তেমন কষ্ট হয় না। যদি হাতে বাজেট থাকে, তাহলে শহরের বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল হোটেলেই থাকা সম্ভব। নিঃসন্দেহেই সোল কিচেন হলো শহরে সেরা হোটেলগুলোর একটি। রয়েছে স্টাইলিশ শাও মামা হোটেল। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য ডর্মেটরি। শহরের অল্প কয়েকদিনের জন্য ঘুরতে গেলে এই জায়গাগুলোতে রাত্রিযাপন করাই শ্রেয় এবং নিরাপদ।
একটু খরচ করতে চাইলে বিলাসবহুল বেলমন্ড গ্র্যান্ড হোটেল ইউরোপে সবচেয়ে সেরা। হোটেলের ভেতরের পুরোটাই তৈরি করা হয়েছে মার্বেল পাথরে, জানালাগুলো স্টেইনড গ্লাসের। ক্ল্যাসিক ধাঁচে রুমগুলো সজ্জিত করা হয়েছে রাশিয়ান পেইন্টিং, অ্যান্টিক এবং প্লাশ ফ্যাব্রিক দিয়ে।

সোল কিচেনের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য; সোর্স – Soul Kitchen

ফিচার ইমেজ- russiatrek

var loaded = false; var loadFB = function() { if (loaded) return; loaded = true; (function (d, s, id) { var js, fjs = d.getElementsByTagName(s)[0]; if (d.getElementById(id)) return; js = d.createElement(s); js.id = id; js.src = "http://connect.facebook.net/en_US/sdk.js#xfbml=1&version=v3.0"; fjs.parentNode.insertBefore(js, fjs); }(document, 'script', 'facebook-jssdk')); }; setTimeout(loadFB, 0); document.body.addEventListener('bimberLoadFbSdk', loadFB); })();

Must Read

বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের খানিক ইতিহাস ও দর্শনীয় স্থানগুলো

বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত গৌড় নগর ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় অন্যতম বৃহৎ নগরী। এটি বাংলার প্রাচীন রাজধানী। আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত...

সুন্দরবনের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ

বাংলাদেশের মধ্যে যে কয়েকটি স্থান ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। এখানে সুন্দরী গাছের আবাসস্থল রয়েছে এবং এটি...

দ্বিতীয় দিন-দুপুরের আগে পৌঁছাতে হবে কালাপোখরি

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ওয়াশরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে, বসে আছি কিছুক্ষণ। তখনো ভোর হয়নি, হঠাৎ বামে তাকালাম। আমি যা দেখলাম পরের ৫ মিনিট আমি...