সিলেট পর্ব

ঘুরতে আমরা সবাই কমবেশি পছন্দ করি। আমরা যারা ছাত্র অবস্থায় ঘোরাঘুরি করি তারা সাধারণত একটা গ্রুপে কয়েকজন মিলে ঘুরতে পছন্দ করি। এই দলবেঁধে ঘুরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হলো টাকা। দেখা যায় প্রচুর ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও অনেকেই শুধু টাকার অভাবে ঘুরতে যেতে পারে না। আবার অনেকেই মনে করে ঘুরতে যেতে মনে হয় অনেক টাকার দরকার, তাই সেভাবে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে না।

একজন লেখক হিসেবে নয় বরং একজন ভ্রমণকারী হিসেবে বলছি, ঘুরতে গেলে তেমন আহামরি কোনো টাকার প্রয়োজন নেই। যা প্রয়োজন তা হলো সময় আর ইচ্ছে। তাই এই বাজেট ট্রিপের সিরিজটি শুরু করতে যাচ্ছি। এই সিরিজে মূলত আমার ঘুরে আসা জায়গাগুলোতে যাওয়ার উপায় আর যাবতীয় খরচের কথা প্রাধান্য পাবে। আজকে সিলেট ঘুরতে যাবতীয় খরচের কথা বলবো। তো চলুন শুরু করি সিলেটের বাজেট ট্রিপের আদ্যোপান্ত।

রাতারগুল, ছবিঃ সৌনক চাকমা

আমরা সবাই জানি সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর বিভাগ। সিলেটের মূল সৌন্দর্য প্রকাশ পায় বর্ষাকালে। সিলেটে ঘুরতে যাওয়ার প্রচুর জায়গা আছে। তাদের মধ্যে প্রথমেই যে জায়গাগুলোর কথা উঠে আসে সেগুলো হলো জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, শ্রীমঙ্গলের মাধবকুণ্ড, হামহাম জলপ্রপাত, লালাখাল, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকেরহাট, জাদুকাটা নদী, শিমুল বাগান। একবারে সিলেট ভ্রমণ শেষ করতে হলে আপনাকে সিলেট থাকতে হবে অন্ততপক্ষে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি।

হামহাম জলপ্রপাত, ছবিঃ লেখক

প্রথমেই আসি থাকার খরচের কথা। সিলেটে হোটেল ভাড়া অন্যান্য জায়গার তুলনায় একটু বেশি। সিলেট শহরে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা আম্বরখানার আশেপাশে।

মোটামুটি মানের একটি হোটেলের ভাড়া ১,২০০-২,০০০ পর্যন্ত হতে পারে। এক রুমে ৪ জন পর্যন্ত থাকা যাবে। তাই জনপ্রতি থাকার খরচ প্রতিদিন পড়বে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে।

খরস্রোতা মাধবকুন্ড, ছবিঃ রাশিক রহমান

একবারে সিলেট ভ্রমণ করতে যে টাকা যাবে ভেঙে ভেঙে সেটা করলে একবারের তুলনায় কমপক্ষে ৩-৪ হাজার টাকা বেশি যাবে। তাই সময় আর শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলে একবারেই ঘুরে আসুন সিলেট থেকে। সিলেটের আশেপাশের জায়গাগুলো যেমন বিছানাকান্দি, রাতারগুল, জাফলং, লালাখাল, শ্রীমঙ্গল যেতে আপনাকে সিএনজি/অটো/চান্দের গাড়ি ভাড়া করতে হবে।

সিলেট থেকে এসব জায়গায় যাওয়া-আসা করার জন্য সিএনজি/অটো/চান্দের গাড়ির ভাড়াগুলো নিচে দিয়ে দিলাম। ভাড়াগুলো একটা সিএনজির/অটোর/চান্দের গাড়ির জন্য যেখানে যথাক্রমে ৫ জন, ৬ জন এবং ৮ জন বসতে পারে।

১. সিলেট-জাফলং-সিলেট= ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকা (সিএনজি)
২. সিলেট-গোয়াইনঘাট-হাঁদারপাড়-বিছানাকান্দি (নৌকা)- হাঁদারপাড়-সিলেট=  ৪০০ (সিএনজি) + ২০০ (সিএনজি) + ১,৫০০ (নৌকা) + ৬০০ (সিএনজি) টাকা
৩. সিলেট- সাহেববাজার-রাতারগুল-রাতারগুল নৌকা ভ্রমণ-সিলেট= ৩০০ (অটো) + ১০০ (অটো) + ৬০০ (নৌকা) + ৪০০ (অটো) টাকা
৪. সিলেট-শ্রীমঙ্গল- মাধবকুণ্ড- শ্রীমঙ্গল-সিলেট= ২০০ (বাস) + ৬০০ (সিএনজি) + ৬০০ (সিএনজি) + ২০০ (বাস) টাকা
৫. সিলেট- হামহাম- গাইড- হামহাম- সিলেট= ২,৫০০ টাকা চান্দের গাড়িতে আসা-যাওয়ার ভাড়া+ ৩৫০ টাকা গাইড খরচ
৬. সিলেট-লালাখাল-সিলেট = ৮০০ টাকা (সিএনজি)

উপরের ছয়টা জায়গার ভ্রমণ শুরু করতে হয় সিলেটের আম্বরখানার সিএনজি স্ট্যান্ড অথবা সিলেট বাসস্ট্যান্ড থেকে। প্রতিদিন নতুন একটা জায়গায় গেলে এখানেই আপনার ৬ দিন শেষ হয়ে যাবে। তবে ৬টি জায়গা ঠিকঠাক ঘুরে আসতে পারলে সিলেটের সিংহভাগ আপনার ঘোরা শেষ।

আর যদি একদিনে দুই জায়গায় চলে যেতে পারেন যেমন ধরুন সকাল সকাল বেরিয়ে গেলেন জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে, দুপুরের আগে আগে ফেরত আসলেন। তারপর সিলেটে খাওয়া দাওয়া করে আবার বেরিয়ে পড়লেন রাতারগুলের উদ্দেশ্যে। এইভাবে ঘুরলে দিন কম লাগবে সিলেটের আশেপাশের জায়গাগুলো ঘুরতে।

বিছানাকান্দি, ছবিঃ লেখক

সিলেটের আশেপাশের জায়গা ঘুরে দেখা হয়ে গেলে পা বাড়ান সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে। তবে এক্ষেত্রে আগে থেকে জেনে যেতে হবে টাঙ্গুয়ার হাওরে পানি আছে কিনা। যদি পানি না থাকে অর্থাৎ যদি সময়টা গ্রীষ্মকাল হয় তবে সুনামগঞ্জের পরিকল্পনা বাদ দিন। সুনামগঞ্জ যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হলো বর্ষা শুরুর ঠিক কিছুদিন পরেই। সুনামগঞ্জ যেতে হলে প্রথমেই চলে আসুন কুমারগাঁও বাস স্ট্যান্ডে।

আম্বরখানা থেকে জনপ্রতি সিএনজি ভাড়া নেবে ২০-২৫ টাকার মতো। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক পাশেই কুমারগাঁও বাস স্ট্যান্ড। কুমারগাঁও বাস স্ট্যান্ড থেকে আধ ঘণ্টা পর পর সুনামগঞ্জের বাস ছেড়ে যায়। কুমারগাঁও থেকে সুনামগঞ্জের জনপ্রতি বাস ভাড়া ৯০ টাকা। সুনামগঞ্জ যেতে লাগবে পাক্কা ৩ ঘণ্টা। সুনামগঞ্জ পৌঁছে বাস স্ট্যান্ড থেকে একটু সামনে এগোলেই লেগুনা স্ট্যান্ড পাওয়া যাবে। লেগুনা দিয়ে যেতে হবে তাহিরপুর বাজারে।

একটি লেগুনায় বসতে পারে ১২ জন, ভাড়া ৮০০ টাকা। তাহিরপুর বাজারে পৌঁছে নৌকা ঠিক করে নিন। গ্রুপ যদি ১০ জনের হয় তবে মাঝারি সাইজের একটা নৌকা নিলেই হবে। রাতে নৌকায় থাকুন। এই নৌকা আপনাকে টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকেরহাট, জাদুকাটা নদী নিয়ে যাবে, নিয়ে আসবে এবং নৌকায় আপনি সেদিন রাতে থাকবেন। ভাড়া নেবে ৪,৫০০- ৫,০০০ টাকার মতো।

টাংগুয়ার হাওড়, ছবিঃ লেখক

টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে যখন টেকের হাটে যাবেন তখন টেকেরহাট নেমে মোটরসাইকেলে করেও জাদুকাটা নদী যাওয়া যায়। পানি যদি কম থাকে সেই ক্ষেত্রে নৌকায় জাদুকাটা নদীতে যাওয়া সম্ভব হয় না। প্রতি মোটরসাইকেলে ২ জন বসতে পারে। প্রতি মোটরসাইকেলের ভাড়া (যাওয়া+ আসা) ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।

জাদুকাটা নদী ঘুরে ফেরার পথে নিলাদ্রী লেকে বিকেল বেলাটা কাটান ধীরে সুস্থে। আশেপাশের মানুষদের জিজ্ঞেস করলেই শিমুল বাগানটা দেখিয়ে দেবে। ঘুরে আসুন শিমুল বাগান থেকে। রাতটা নৌকাতেই কাটান।

জাদুকাটা নদী, ছবিঃ লেখক

টাঙ্গুয়ার হাওর ঘোরা শেষ হলে আপনার সিলেট ভ্রমণ মোটামুটি শেষ বলা চলে। এখন আসি খাবার-দাবারের ব্যাপারে। হোটেল ভাড়ার মতো সিলেটে খাবার-দাবারের দামও একটু বেশি। তবে সস্তায় খাবার হোটেলের অভাব নেই আম্বরখানায়। যদি একটু ভাল খেতে চান আম্বরখানা থেকে জিন্দাবাজার চলে যান।

সিলেটের বিখ্যাত “পানসী হোটেল” আছে সেখানে। পানসীতে দামও তুলনামূলক ন্যায্য। এমনিতে পানসীতে একবেলা খাবার জন্য ১৫০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত জনপ্রতি খরচ করার সুযোগ আছে। আর এমনি যে খাবার হোটেলগুলো আছে সেগুলোয় প্রতিবেলা খেতে চাইলে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা যথেষ্ট।

তাহলে প্রতিজনের ৮ দিনের সিলেট ভ্রমণের মোট হিসেবটা দাঁড়ায় অনেকটা এরকম-
১. ৮ দিনের হোটেল ভাড়া= ৫০০*৮= ৪,০০০ টাকা
২. ৮ দিনের খাবার খরচ= (৫০+১২০+১৫০)*৮= ২,৫৬০ টাকা
৩. ৮ দিনের ভ্রমণ সংক্রান্ত খরচ= ৩,০০০ টাকা

মোট ৯,৫৬০ টাকা মানে ১০,০০০ টাকা নিয়ে খুব ভালোভাবে আপনার পুরো সিলেট ভ্রমণ হয়ে যাবে। এখন আপনি যদি একবারে না গিয়ে ভেঙে ভেঙে আমার মতো দুই তিন বার সিলেট গিয়ে সিলেট ভ্রমণ শেষ করতে ইচ্ছুক থাকেন তবে প্রতিবারে আপনার খরচ হবে প্রায় ৫,০০০ টাকার মতো। যদি তিনবার সিলেট যান (সাধারণত ভেঙে ভেঙে গেলে তিনবারই যেতে হয়) তবে খরচ গিয়ে দাঁড়ায় ১৫,০০০ টাকায়।

ছবিঃ লেখক

সিলেটে খরচ বাঁচানোর একদম সহজ উপায় হলো একদিনে দুই জায়গায় ঘুরে সিলেটের হোটেলে থাকার দিন এবং হোটেল ভাড়া কমিয়ে আনা। হোটেলে যদি না-ই থাকতে হয় তবে প্রতিদিনকার খাবার খরচটাও বেঁচে যাবে। সেক্ষেত্রে ৮,০০০ থেকে ৮,৫০০ টাকায় পুরো সিলেট ভ্রমণ করা সম্ভব। আর শুধু ছেলেদের গ্রুপ হলে থাকার হোটেলের গুণগত মান কোনো ব্যাপার না।

চিন্তা করবেন, আপনি এখানে ঘুরতে এসেছেন, হোটেলে থাকবেন কেবল ঘুম আর গোসলের জন্য। তাই বিলাসবহুল হোটেলের দিকে না আকৃষ্ট হয়ে মোটামুটি মানের হোটেলগুলোই হয় বাজেট ট্রাভেলারদের প্রধান পছন্দ। খাবারের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে। এত এত জায়গা ঘুরে যখন দেখবেন পকেটে এক-দেড় হাজার টাকা রয়ে গেছে তখন সত্যি ভালো লাগবে। ভ্রমণ হোক সুন্দর, সাশ্রয়ী আর প্রাঞ্জল।

ফিচার ইমেজ- লেখক

var loaded = false; var loadFB = function() { if (loaded) return; loaded = true; (function (d, s, id) { var js, fjs = d.getElementsByTagName(s)[0]; if (d.getElementById(id)) return; js = d.createElement(s); js.id = id; js.src = "http://connect.facebook.net/en_US/sdk.js#xfbml=1&version=v3.0"; fjs.parentNode.insertBefore(js, fjs); }(document, 'script', 'facebook-jssdk')); }; setTimeout(loadFB, 0); document.body.addEventListener('bimberLoadFbSdk', loadFB); })();

Must Read

বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের খানিক ইতিহাস ও দর্শনীয় স্থানগুলো

বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত গৌড় নগর ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় অন্যতম বৃহৎ নগরী। এটি বাংলার প্রাচীন রাজধানী। আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত...

সুন্দরবনের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ

বাংলাদেশের মধ্যে যে কয়েকটি স্থান ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। এখানে সুন্দরী গাছের আবাসস্থল রয়েছে এবং এটি...

দ্বিতীয় দিন-দুপুরের আগে পৌঁছাতে হবে কালাপোখরি

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ওয়াশরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে, বসে আছি কিছুক্ষণ। তখনো ভোর হয়নি, হঠাৎ বামে তাকালাম। আমি যা দেখলাম পরের ৫ মিনিট আমি...