সুন্দরবনের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ

বাংলাদেশের মধ্যে যে কয়েকটি স্থান ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। এখানে সুন্দরী গাছের আবাসস্থল রয়েছে এবং এটি অসংখ্য প্রাণীর অবিরাম ছুটে চলার অভয়ারণ্য। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুপরিচিত বন হলো রুপসী বাংলার সুন্দরবন।
সুন্দরবনের বিস্তৃতি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালি ও বরগুনা জেলার কিছু অংশ নিয়ে। বাংলাদেশ ও ভারতে যৌথভাবে সুন্দরবনের আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার হলেও বাংলাদেশে সুন্দরবনের আয়তন ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার।

ছবিসূত্রঃ sundarbann.com

সুন্দরবনের বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য জীবজন্তু ও গাছপালা। এছাড়া এখানে রয়েছে অনেক নদীনালা। সুন্দরবনের নদীগুলো নোনাপানি ও মিঠাপানির মিলনস্থান। ভারতের গঙ্গা থেকে আসা পানি মিঠাপানি এবং বঙ্গোপোসাগরের লোনাপানি উভয়ের সমন্বয় সুন্দরবনে পাওয়া যায়। জীবের অভয়ারণ্য ও সবুজের চাদর ঢাকা এই বনকে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জাদুঘর বললেও ভুল হবে না।

যেভাবে সুন্দরবনের নামকরণ করা হয়

সুন্দরবনের নামকরণ করা হয়েছে সুন্দরী গাছের নামানুসারে। সুন্দরবনে অসংখ্য সুন্দরী গাছ জন্ম নেয় প্রতিনিয়ত। তাই এই বনের নাম সুন্দরবন রাখা হয়। বাংলায় সুন্দরবনের আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় সুন্দর জঙ্গল।

সুন্দরবন যেন বিচিত্র ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদের রাজ্য

ছবিসূত্রঃ Mahanagar 24×7

সুন্দরবনে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। চারদিকে সবুজ আর সবুজ বন। মাঝখানে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল এই সুন্দরবন।

ছবিসূত্রঃ http://naturalinbeauty.blogspot.com

এখানে বাঘ, হরিণ, চিত্রা হরিণ, কুমির, অজগর সাপ, রাজগোখরা, কচ্ছপ, উদবিড়াল, গণ্ডার, মহিষ, শুশুক, কচ্ছপ, গিরগিটি ইত্যাদি রয়েছে। রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি ও অণুজীব। ৩৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫টি প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী বাস করে সুন্দরবনে।
যারা উদ্ভিদ ও প্রাণী নিয়ে গবেষণা করতে চায় তাদের জন্য সুন্দরবন যেন স্বর্গরাজ্য। সুন্দরবনে অবাধে ছুটে চলে হরিণের দল। বানরেরা নিজের মতো খুনসুটি আর অভিমান নিয়ে বসবাস করে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার পুরো বনে কেমন যেন দখলদারের মতো রাজত্ব করে চলে।

ছবিসূত্রঃ offroadbangladesh

সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য সুপরিচিত। ২০০৪ সালের এক হিসেবে বলা হয়েছে, সুন্দরবনে প্রায় ৫০০ প্রজাতির রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বসবাস রয়েছে। তবে দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের জীব ও প্রাণী সম্পদ। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার হরিণ ও মানুষ শিকারে অভ্যস্ত। বনে মধু সংগ্রহ করতে আসা মৌয়াল ও অন্যান্যদের উপর শিকার হিসেবে থাবা দেয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

ছবিসূত্রঃ জাকিরের টেক ডায়েরি

কুমির ও অন্যান্য প্রানীরা নোনা ও মিঠা পানির সন্ধিস্থলে অবাধে বিচরণ করে এবং বেঁচে থাকে। তবে দিনকে দিন ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাসস্থান নির্মাণ সহ পরিবেশ দূষণ, পশু শিকার ও মেরে ফেলা, বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে সুন্দরবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাণীসম্পদ।

ছবিসূত্রঃ Dhakatimes24

সুন্দরবনে রয়েছে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, গোলপাতা, গরান, পশুর, বাইন, হেতাল ইত্যাদি অসংখ্য প্রজাতির গাছ। বলা হয়, সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে।
সুন্দরবন মৎস সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডার। সুন্দরবনে রয়েছে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ১৩ প্রজাতির কাঁকড়া, ২৬ প্রজাতির চিংড়ি, ৪২ প্রজাতির মালাস্কা। অনেকে ধারণা করেন, সুন্দরবনে শিরদাঁড়াওয়ালা মাছ রয়েছে কমপক্ষে ৩০০ প্রজাতির। কালা হাঙর, ইলশা কামট, ঠুটি কামট মাছ পাওয়া যায় এখানে, যা অন্য জায়গায় বিরল।

দর্শনীয় স্থানসমূহ

দুবলার চর

সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হলো দুবলার চর। একে মূলত জেলে গ্রাম বলা হয়। প্রতিনিয়ত জেলেরা মাছ থেকে শুঁটকি বানায়। শীতকাল ও বর্ষাকালে জেলেরা বেশি ব্যস্ত থাকে। এখানকার শুঁটকি চট্টগ্রাম ও অন্যান্য জায়গায় বিক্রি হয়। কার্তিক মাসে রাসমেলা ও পুণ্যস্নান হয় বলে এই চরটি খুব বিখ্যাত। দুবলার চর থেকে নদী বয়ে গেছে বঙ্গোপোসাগরের পথে।

জামতলা সৈকত

সুন্দরবনের অপরুপ সৌন্দর্যের বেশ কিছু উপভোগ করা যায় জামতলা সৈকত থেকে। জামতলায় সুউচ্চ টাওয়ার রয়েছে। জামতলায় বাঘ কিংবা হরিণের দেখাও পাওয়া যায় মাঝে মাঝে।

হিরণপয়েন্ট

ছবিসূত্রঃ জাকিরের টেক ডায়েরি

সুন্দরবনের হিরণপয়েন্টে রয়েছে কাঠের তৈরি সুন্দর রাস্তা যেখান থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রাণী দেখা যায়। মাঝে মাঝে হরিণ, কুমির, বানর, গুইসাপ ছাড়াও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা পাওয়া যায় হিরণপয়েন্ট থেকে।

কটকা বিচ

ছবিসূত্রঃ http://offroadbangladesh.com

কটকা বিচ খুব সুন্দর ও মনোরম। এখানে লাল কাঁকড়ার দল দলবেঁধে চলে। নরম মাটিতে কেওড়া গাছ দাঁড়িয়ে থাকে দৃঢ় পায়ে। কটকা বিচে রয়েছে প্রচুর ভাঙা গাছের গুড়ি। পাখির ডাক কিংবা দূরের কোনো প্রাণীর ডাকে কটকা বীচের সকল নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে যায়। এখানে সূর্যের অস্ত যাওয়া যেন অন্যরকম শিল্প।

মান্দারবাড়িয়া সৈকত

মান্দারবাড়িয়া সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। গাছের সবুজ মায়া ও পশুপাখির বসবাসপূর্ণ এই অঞ্চলে জড়িয়ে রয়েছে অনেক মায়া।

হাতবাড়িয়ার মিঠা পুকুর

ছবিসূত্রঃ জাকিরের টেক ডায়েরি

সুন্দরবনের আরেকটি দর্শনীয় স্থান হলো হাতবাড়িয়ার মিঠা পুকুর। এই পুকুরের পানি মিঠা বলে বনের প্রাণীরা পানি পান করতে ছুটে চলে আসে পুকুরে। চলার পথে হরিণ, গিরগিটি, সাপ চোখে পড়ে। অসংখ্য পর্যটক সুন্দর এই পুকুরটি দেখতে ছুটে আসে হাতবাড়িয়ায়।

সুন্দরবনে যাওয়ার প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য

  • অভিজ্ঞ একজন ট্যুর গাইডের সংস্পর্শে থাকুন।
  • নিরাপদ ও ফুটানো খাবার পানি সাথে রাখুন। সেখানে খাবার পানি পাওয়া বিরল বলা যায়।
  • প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামাদি ও বক্স সাথে রাখুন।
  • প্রয়োজনে কয়েকজন বনপ্রহরী সাথে রাখুন।

যাওয়ার ব্যবস্থা

ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ছাড়ে। হানিফ, ঈগল, সোহাগ ইত্যাদি বাস ভোর ৬টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত খুলনার উদ্দেশ্যে যায়। ঢাকা থেকে খুলনা যেতে ৮ ঘন্টা সময় লাগে। খুলনা থেকে প্রথমে মংলা তারপর লঞ্চ বা অন্য নৌযান ভাড়া করে সুন্দরবনের করমজলে যাওয়া যাবে। মংলায় রাত যাপনের জন্য দুটো হোটেল আছে, সিঙ্গাপুর ও ব্যাংকক। পরদিন সকালে স্পিডবোট, লঞ্চ বা জাহাজে করে সুন্দরবন ভ্রমণে যাওয়া যাবে।

var loaded = false; var loadFB = function() { if (loaded) return; loaded = true; (function (d, s, id) { var js, fjs = d.getElementsByTagName(s)[0]; if (d.getElementById(id)) return; js = d.createElement(s); js.id = id; js.src = "http://connect.facebook.net/en_US/sdk.js#xfbml=1&version=v3.0"; fjs.parentNode.insertBefore(js, fjs); }(document, 'script', 'facebook-jssdk')); }; setTimeout(loadFB, 0); document.body.addEventListener('bimberLoadFbSdk', loadFB); })();

Must Read

জেনে নিন খুঁটিনাটি

ভ্রমণে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর কারণ ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারের মাধ্যমে অনেকগুলো বিষয় খুব সহজে করা যায়, যার ফলে আপনার...

রাশিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

সেন্ট পিটার্সবার্গ হলো রাশিয়ার সবচেয়ে পশ্চিমাভাবাপন্ন শহর। বাস্তবধর্মী জীবনধারণের এই শহরটাতে মস্কোর চেয়েও বেশি ইউরোপিয়ান ছায়া রয়েছে। অসংখ্য জলধারা বয়ে যাওয়া এই শহরটার ধারে ধারে...

রাশিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

সেন্ট পিটার্সবার্গ হলো রাশিয়ার সবচেয়ে পশ্চিমাভাবাপন্ন শহর। বাস্তবধর্মী জীবনধারণের এই শহরটাতে মস্কোর চেয়েও বেশি ইউরোপিয়ান ছায়া রয়েছে। অসংখ্য জলধারা বয়ে যাওয়া এই শহরটার ধারে ধারে...