৩য় দিন-চূড়ান্ত মরীচিকা সান্দাকফু

জানুয়ারির ৩১ তারিখ। প্রায় ৩০ কিলোমিটার হেঁটে চলে এসেছি। আজকে শেষ দিন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আজকে সান্দাকফু পৌঁছে যাবো।
কালাপোখরি থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটারের রাস্তা, তার মধ্যে দুই কিলো সমতল। সকাল সকাল উঠে আশপাশটা ঘুরে দেখা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। হাত মুখ ধুয়ে বাইরে বেরুলাম হাই তুলতে তুলতে, সকাল সাতটা বাজে ঘড়িতে তখন। গোহাটির সেই ৩০ জনের গ্রুপটা তৈরি হচ্ছে ট্রেকিংয়ের জন্য।
হালকা পাতলা ব্যায়ামও করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। গাইড সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছে কীভাবে কী করতে হবে। আমি শুনছি মন দিয়ে। পাচঁ মিনিটের ব্যবধানে হাঁটা শুরু করলো ওরা। আমি হাই তুলতে তুলতে মনে মনে ভাবলাম, যতই আগে যাও বাছারা, আমরাই আগে সান্দাকফু জয় করবো!

সকালের কালাপোখোরি, ছবিঃ লেখক

আস্তে-ধীরে নাস্তা করলাম সবাই। ঠিক আটটায় ধীরে ধীরে পা বাড়ালাম অনিবার্য গন্তব্যে। হিমালয় যে ডাকছে আমাদের। প্রথম দুই কিলোমিটার অনায়াসে পার করে ফেললাম। পথে প্রচুর বরফ জমে থাকতে দেখলাম, বুঝলাম যতই কাছে যাচ্ছি শীতের প্রকোপ বাড়ছে। আর বিয়ের সাথে যৌতুক পাওয়ার মতো উপরি পাওনা হিসেবে একশো কিলোমিটার বেগে বইতে থাকা বাতাস তো আছেই উপরে।
বিখে ভাঞ্জান পড়ে মাঝখানে, পাসপোর্ট এন্ট্রি করিয়েছিলাম কিনা মনে নেই, এত এন্ট্রির ভিড়ে মনে থাকে কি? বিখে ভাঞ্জান থেকে দূরে তাকিয়ে দেখছিলাম ত্রিশ জনের গ্রুপটা উঠে যাচ্ছে। এগোতে লাগলাম সবাই মিলে, দেখলাম পিচ্চি একটা বাচ্চা ছেলে মায়ের সাথে তরতর করে উঠে যাচ্ছে। অভিযোজন বুঝি একেই বলে! মিনিট ত্রিশেক পর উচুতে উঠতে লাগলাম আমরা। এখান থেকে আর তেমন সমতল নেই, কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল না খাড়া পথে একদমই।

মেঘের উপরে সোম বাহাদুর জী আর ইমন ভাই, ছবিঃ লেখক

পাহাড় গ্রহণ করে নিয়েছে আমাদের গত দুই দিনে। উপর থেকে দেখছিলাম পুরো পথটাই দেখা যাচ্ছে আমরা যেখান দিয়ে এসেছি। মোবাইলের ক্যামেরায় ধারণ করার চেষ্টা করলাম এই দৃশ্য, কিন্তু ছবিগুলো দেখলে বুঝি, বাস্তবের ধারেকাছেও আনতে পারিনি, আনা সম্ভব নয়। জন ডেনভারের কান্ট্রি রোড আর বিটলসের সব গান শুনতে শুনতে হাঁটতে লাগলাম আর ভাবতে লাগলাম কতগুলো কিলোমিটার পেছনে ফেলে এসেছি।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটু উঁচু সরু জায়গায় উঠে গেলাম আর জনা ত্রিশেকের সেই গ্রুপটাকে পেয়ে গেলাম, বরাবরের মতো তারা আমাদের দেখে হতাশ। ওদের চেহারার আদলেই বোঝা যাচ্ছিল ওরা ভাবছে, “এত তাড়াতাড়ি কীভাবে সম্ভব”! অবশ্য এর কারণ ছিল, দল বড় হওয়ায় সবার একসাথে হাঁটতে বেশি সময় লাগে।

উপর থেকে বিখেভাঞ্জন, ছবিঃ লেখক

বসে আছে ওরা, আমরাও গিয়ে বসে পড়লাম। চোখের সামনে যা দেখছিলাম তা লিখে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। প্রায় পনেরজনের মতো বসে আছি পাহাড়ের একদম ঢালু ঘেঁষে, নিচে সবটা মেঘ। মনে হচ্ছিল, মেঘের কুয়ায় বসে আছি বা মেঘ সমুদ্রে। ভিন্ন জগতের এ দৃশ্য যত দেখছিলাম ততই ভালো লাগছিল।

মেঘ সমুদ্র, ছবিঃ ইমন ভাই

কিন্তু বসে পড়লে তো চলবে না, পৌঁছাতে হবে সান্দাকফু। তাই উঠে দাঁড়ালাম, ব্যাগের ফিতাগুলো শক্ত করে টেনে দিলাম। পাহাড়ের উপর সান্দাকফুর সবচেয়ে বড় হোটেল শেরপা শ্যালে উঁকি দিচ্ছিলো। মনে হচ্ছিল এইতো এসে গেছি, অনেকটা মরিচীকার মতো। মনে হয়, এইতো কাছেই। কিন্তু কাছে গেলে নাই। হাঁটতে লাগলাম রাজ্যের চিন্তা নিয়ে। গত ২ দিনে ট্রেকিংয়ের সময় পানি যত পারি কম খেয়েছি, কিন্তু আজকে আমার পানির বোতলে পানি নেই। বরাবরের মতো একটু পিছিয়ে আছি আমি, সৌন্দর্য গিলতে গিলতে যাচ্ছি। পাহাড়ের ফাঁক গলে মেঘ আর আকশের লুকোচুরি দেখতে দেখতে যাচ্ছি।

উকি দিচ্ছে হিমালয়, ছবিঃ লেখক

তেষ্টা পায় একসময় খুব, উপরে উঠতে থাকা টিম মেম্বারকে চিৎকার করে বলি পিপাসার কথা। বাতাসের কারণে কথা শোনা যাচ্ছিল না। পাশেই এক শেরপা বসে পানি খাচ্ছিলো, হিন্দিতে বললাম পানি হবে কিনা? বললো “নেই”, বুঝলাম পাহাড়ের নিয়ম এটা। তেষ্টা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু হাঁটছিলাম আস্তে আস্তে। সাদা কনক্রিটের পথ পুরোটা এখান থেকে। দূরে দেখলাম টিমের সবাই বসে আছে, এমনকি বাহাদুরজীও।
কেন জানি মনে হলো ওখানটাই মনে হয় সান্দাকফু, অতটুকু পৌঁছালেই হচ্ছে আমার। তড়িঘড়ি ওঠা শুরু করলাম, একসময় পৌঁছেও গেলাম। কিন্তু আশায় গুড়েবালি, এত বড় হৃদয় ভাঙন আমার জীবনে কখনো হয়নি। গিয়ে দেখলাম আরো প্রায় এক কিলোমিটার খাড়া পথ বাকি। শরীরকে ঠেলে উঠাতে পারছি না, এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো আর পারবো না, নিচে নেমে যাবো। সামনে তাকালাম, কাঞ্চনজঙ্ঘা দাঁড়িয়ে আছে তার পরিবার আর প্রতিবেশীদের নিয়ে। বসে বসে দেখলাম কিছুক্ষণ। মাথা ঠান্ডা হলো, আরেকবার হাঁটা শুরু করলাম।

উপরে দেখা যাচ্ছে শেরপা শ্যালেট, ছবিঃ দীপ সেন

কনক্রিটের পথ এক সময় শেষ হয়ে গেল, বাকি সবাই অনেক আগেই উপরে উঠে গেছে। রয়ে গেছি একা আমি, বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কোন পথে যাবো। পথ বাদ দিয়ে পাহাড়ের সাহায্য নিলাম, ছোট ছোট ঢিবি ধরে প্রায় লাফিয়ে উঠলাম একটা উঁচু জায়গায়, একই কায়দায় আরো উঁচুতে উঠে যেতে লাগলাম। আলো-ছায়ায় ঘেরা একটা সরু পথ পেলাম, সেটা ধরেই একসময় এগোতে লাগলাম।
পথের ধারে উপরে তাকালাম, শুধু আকাশ দেখা যায়। মানে কি এসেই পড়েছি অবশেষে? সরু পথ ধরে উপরে উঠতে চেষ্টা করলাম, শেষ সময়ে শরীর একদমই সায় দিচ্ছিল না, যেকোনো সময় পা হড়কে সোজা নিচে পড়ে যাওয়ার ভালো সম্ভাবনা ছিল। কোনমতে নিজেকে সামলে চিকন চিকন গাছ ধরে শেষ কয়েক কদম প্রায় ঝুলে ঝুলে উঠলাম। শেষ পা-টা যেখানি ফেলি সেখান থেকে আর দূরের কোনো পাহাড় দেখা যাচ্ছিল না, কারণ পশ্চিম বাংলার সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়া ছিল আমার পায়ের নিচে। দুপুর তখন ১টা বাজে।

সান্দাকফু তে দেখা পাই স্লিপিং বুদ্ধের, ছবিঃ লেখক

সান্দাকফু জয় করেছি তাহলে! খুশিতে দৌড় লাগালাম, পানির বোতল দেখে দৌড়ে লাগাম লাগিয়ে পেট ভরে পানি খেলাম। বিশ্বাস হচ্ছিল না এত দিনের কষ্ট সার্থক হয়েছে! প্রায় বারো হাজার ফিটের সেই উন্মাদ মাদকতা ভুলবো না কখনো। দৃষ্টিকোণে শুভ্র বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে, মাকালু, পান্ডেম আর এভারেস্ট গেঁথে আছে এখনো। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই।

বাম থেকে অত্রি, আসিফ, ইমন ভাই, আমি, দীপ সেন আর পেছনে ঘুমন্ত বুদ্ধ, ছবিঃ বাহাদুর জী

সান্দাকফুতে সরকারী কটেজ আছে, কিন্তু আমরা শিলিগুড়ি থেকে বুক করে যাইনি তাই খালি থাকার পরেও আমাদের ভাগ্যে জোটেনি সে কটেজ। অবশেষে আশপাশটা একটু ঘুরে দেখার পর রিম্বিক থেকে দুই ভাইয়ের সন্ধান পেলাম, সাতশো রুপিতে তাদের কটেজে পাঁচজনের একটা রুম পেলাম। রুমে উঠেই হাত মুখ ধুয়ে নুডলস ঘুম দিলাম, বিকেলে সান্দাকফুর সূর্যাস্ত উপভোগ করবো। চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠে চলে গেলাম একটা গার্ড রুমের পাশে, মোটামুটি উঁচু এই জায়গায় বড় একটা পাথর আছে, সেটার উপর থেকে বেশ ভালো দেখা যায় হিমালয় রেঞ্জ।
বাঁধ সাধলো ঝড়ো বাতাস, এত বাতাস ছিল সান্দাকফুতে যে ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে থাকাই সম্ভব হচ্ছিল না। কোনোমতে সেই বড় পাথরটায় উঠে বসে পড়লাম, বাকিটা বিকেল যে কী পরিমাণ সুন্দর গেছে আমাদের বলে বোঝানো যাবে না।

বিকেল বেলার কাঞ্চনজঙ্ঘা, ছবিঃ ইমন ভাই

সেদিন আবার ছিল পূর্ণিমা, ৩১ জানুয়ারি। বাতাসের আতিশয্যে কাচে ঘেরা সেই গার্ড রুমে ঢুকে চারদিকটা দেখতে লাগলাম। আশেপাশে কেউ ছিল না আমরা ছাড়া, ছিল না কোনো বাতি। শুধু দিগন্ত জুড়ে লাল আভা আর ঝাড় গাছের ফাকে চাঁদ দেখা যাচ্ছিল। পাক্কা দেড় ঘন্টা অন্ধকারে চুপচাপ বসে ছিলাম, এই নিস্তব্ধতার জন্যই তো এতদূর আসা!

কাঁচঘরের কাঁচে সান্দাকফুর সন্ধ্যা ,ছবিঃ লেখক

রাতের নিশ্চুপ সান্দাকফুতে হালকা ঘুরে রুমে ঢুকে পড়লাম, বাইরে ঠাণ্ডা প্রচুর। আসামের এক গার্ড এসেছিল কটেজে, অনেকক্ষণ আড্ডা দিল আমাদের সাথে। গত কয়েকদিন আগের তুষারপাত দেখালো মোবাইল ঘেটে। বেশ আমুদে মনে হলো লোকটাকে। আগুন পোহাতে পোহাতে আড্ডাটা জমছিল বেশ। রাতে বিস্কিট, চকলেট খেয়ে নিলাম, আর শুয়ে পড়লাম তাড়াতাড়ি, কারণ ট্রেকিং এখনো শেষ হয়নি।

(চলবে…)

১ম পর্ব: https://tripzone.xyz/sandakphu-trek-day-1
২য় পর্ব: https://tripzone.xyz/sandakphu-trek-day-2
ফিচার ইমেজ: Sherpa Chalet, Sandakphu; Source: team-bhp.com

Must Read

বান্দরবান পর্ব

বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ ধরে রেখেছে এদেশের সবচেয়ে সুন্দর অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে রয়েছে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি সহ আরো অনেক জেলা।...

স্বপ্নপুরির জগতে একটি দিন

সাধারণ পার্কের সঙ্গে থিম পার্কের পার্থক্য হচ্ছে, এটি একটি থিম বা বিষয়বস্তুর ওপর তৈরি করা হয়। সেই থিমকে কেন্দ্র করে এর স্থাপনা এবং রাইডগুলো...

যে গিরিতটের নীলিমায় হারিয়ে যাওয়া যায় অনায়াসেই

বান্দরবান যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছিল দু’মাস আগ থেকে। কিন্তু দিন তারিখ ঠিক হচ্ছিল না কিছুতেই। দু’দিন পর পর নীল আর ইমুর কাছে ভাঙা ক্যাসেট প্লেয়ার...